উইয়ের গোপন শব্দ
অফিস
যাতায়াতের পথে ফুটপাথবাসী এক বৃদ্ধের সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হয়, কথা হয়। আমি সে
বৃদ্ধের নাম জানি না। সত্যি বলতে কী, আমি সে বৃদ্ধ সম্বন্ধে যতটুকু জানি, সেটাও ওই
বৃদ্ধের এলোমেলো ছুঁড়ে দেওয়া কিছু কথার নির্যাস আর আমার নিজস্ব কিছু কল্পনার
কাটাকুটি ছাড়া আর কিছুই না। তবু সময়-সুযোগ পেলেই বন্ধু-বান্ধব, নিকট জনের
হাসি-ঠাট্টা উপেক্ষা করে আমি সে বৃদ্ধের সঙ্গে একটু “হাঁটি-হাঁটি-পা-পা” করে নিতে
ভালোবাসি।
আর ও “কাজ”টা
করতে গিয়ে যা হয় আর কী... ফুটপাথবাসীর সঙ্গে দিনের পর দিন এমন আলাপচারিতা ধম্মে সইলেও
সইতে পারে, কিন্তু পরিবারে? ঠিক ধরেছেন - অমনটা ভাবাও অপরাধ। আমার এমনতরো অপরাধের জন্যে
আমার স্ত্রী নীপা মাঝে একদিন বেশ ব্যাঙ্গের সুরেই বলল, তুমি কি ওই লোকটার মধ্যে “ভিখারি সাহেব”কে খোঁজো নাকি?
বিবাহিত
মানুষ মাত্রই এ কথা বুঝবেন যে এ সব কথার কোনও উত্তর দিতে যাওয়া মানে বিপদ আরও বাড়িয়ে
তোলা। তাই আমি চুপ। চুপ করে থাকলে অন্যত্র ছাড় পাওয়া যেতে পারে কিন্তু এখানে?
অসম্ভব! ও দিক থেকে ফের শুরু হল, শোনো, এ ভাবে লোক হাসিও না। তারপর ধাপে ধাপে ও
দিক থেকে আরো এলো, চেনা নেই জানা নেই, কে না কে - তার গা ঘেঁষে বসা, গল্প করা।
তোমার মাথায় এ ভূত যে কীভাবে চেপে বসল কে জানে। বুঝতে পারছি, সবই আমার কপালের দোষ।
অমন
বাক্যবাণের পরেও আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে উল্টোদিকে রাগ নিশ্চয়ই বাড়ছিল। সেটা টের
পেলাম পরবর্তী বাক্যে। আর হ্যাঁ, মনে রেখ ঘরে ছোট বাচ্চা আছে, তাই এবার থেকে বাড়ির
বাইরেই ভালো করে হাত-পা ধুয়ে তারপর ঘরে
ঢুকবে।
শ্রীমতির
ধাপে ধাপে প্রকাশিত বক্তব্যের নির্যাস ছিল পরিষ্কার। “ও পথ ছাড়ো”।
কিন্তু
আমি কেন ওই বৃদ্ধর কাছে তারপরেও বারবার ছুটে যাই, সেটা, সত্যি বলতে কী, আমার কাছে পুরোপুরি
পরিষ্কার নয়। হতেই পারে এ ক্ষেত্রে মনের গভীরে চুপচাপ পড়ে থাকা এ হয়ত সেই লুকোনো
আবেগ, যেখানে জড়িয়ে আছে “ও হেনরি”র
গল্প থেকে উঠে আসা কিছু সাধারণ মানুষের অসাধারণ ব্যাপ্তির দ্যোতনা। হতেই পারে এ
আমার ব্যক্তিগত আবেগের এক অন্যরকম টানাপড়েন। কেন জানি না ওই বৃদ্ধকে অল্প ক’দিনের চেনা-জানায় আমার মনে হয়েছে যে, উনি সামান্য স্মৃতিভ্রংশ এক
প্রাজ্ঞ মানুষ, যিনি সমাজ-সংসারের উপর অভিমান করে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন দূরে, অনেকটাই
দূরে। আমি কি সে জন্যেই একটু একটু করে
আমার অপটু তুলিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি সেই বৃদ্ধের আসল সুলুককে? এবং এও কি আসলে
সেই উইলিয়াম সিডনি পোর্টার তথা ও হেনরির গল্পের সুফল অথবা কুফল? আমি জানি না, আমি
সত্যিই জানি না।
ওই
বৃদ্ধের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ এক বৃষ্টির সন্ধ্যায়। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে
তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির তোড় এতটাই যে তা ছাতায় বাগ মানছিল না। ফলে বাড়ির খুব
কাছাকাছি এসেও আমাকে মাথা বাঁচানোর জন্যে আশ্রয় নিতে হয়েছিল একটা দোকানের দরজায়।
সেখানেই সেদিন প্রথম চোখে পড়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে দু-হাত তুলে এক বৃদ্ধ মনের
আনন্দে ভিজছেন। একা। ওই প্রায়ান্ধকারেও মনে হয়েছিল যে সে বৃদ্ধের মুখ জুড়ে ছড়িয়ে
আছে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
বৃদ্ধকে
ওভাবে ভিজতে দেখে, কী মনে হল, বলেই ফেললাম, ও ভাবে ভিজছেন, ঠান্ডা লেগে যাবে যে।
আমার পাশে দাঁড়ানো, আমারই মতন বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচানো একজন বলে উঠলেন, আপনি
বৃথাই ওকে নিয়ে চিন্তা করছেন। ওদের কিস্সু হবে না, ওদের কিস্সু হয় না। ওরা ফূটপাথে
থাকে, ফুটপাথে ভেজে। ওদের অভ্যেস হয়ে গেছে। যত রোগ দেখবেন খালি আমাদেরই তাড়া করে।
অমন
সৌম্য দর্শন একজন লোকের বাস ফুটপাথে, এ কথা ভাবতেই আমার কেমন যেন কষ্ট হচ্ছিল।
বৃদ্ধ “সম্ভবত” নয়, “নিশ্চিতভাবেই” শুনতে পেয়েছিলেন আমাদের
কথাগুলো। ফলাফল - আমাদের অবাক করে তাঁর
গলা বেয়ে উদাত্ত ভেসে এল, “বৃষ্টি নামল যখন আমি উঠোন পানে
একা/ দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা”। বজ্রপাতের
মতো লাইনদুটো নেমে আসার পর খেয়াল করলাম, পরিচিত প্রিয় কবিতার দু-টো লাইনের শক্তি
আমার আশপাশকে আশ্চর্য চুপ করিয়ে দিয়েছে। আমার মনে হল, এই বৃদ্ধর সঙ্গে কথা হবে, নিশ্চিত
আরও কথা হবে কোনও একদিন “সারাটা দুপুর”।
এরপর
থেকে প্রায়ই অফিস ফেরৎ আমি চেষ্টা করতাম সেই বৃদ্ধর সঙ্গে আলাপ জমানোর।
প্রথম-প্রথম বৃদ্ধ মোটেই পাত্তা দিতেন না, পরে আস্তে-আস্তে টের পেতে শুরু করলাম
যে, বন্ধ দরজাটা অনেকটাই খুলেছে। হ্যাঁ, অনেকটা - তবে পুরোটা নয়।
সেই আলাপ
জমানো পর্বের সম্টুকু পার হয়ে একদিন
জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, সত্যি করে
বলুন তো, আপনি কে? আপনার বাড়ি কোথায়?
আমার
প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ অবাক চোখে আমার পা থেকে মাথা অবধি বার কয়েক চোখ বুলিয়ে খুব আস্তে
আস্তে বলেন -
-
আরে আমি যদি জানতামই যে আমি কে,
আমার বাড়ি কোথায়, তাহলে কী আর এই ফুটপাথে পড়ে থাকি।
-
কেন জানি না আপনার কথা-বার্তা
শুনে মনে হয় আপনি মোটেও ভবঘুরে নন। আপনার নিজের বাড়ি আছে, আপনার সংসার আছে। আমি
স্পষ্ট বলি।
-
আরে না না, সে রকম কিছু নয়। আমি
ভবঘুরে। বৃদ্ধ অগোছালো মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন।
-
আপনার নিজের কথা কিছু মনে পড়ে না?
আমি হঠাৎ আরও সত্য সন্ধানী।
-
হ্যাঁ, মনে পড়ে। কিছু-কিছু মনে
পড়ে। বৃদ্ধ ভুরু কুচকে বলেন।
-
কী মনে পড়ে, কতটুকু মনে পড়ে -
একটু বলুন না শুনি। আমি আলাদীনের প্রদীপের সন্ধান পেয়েছি, এমন ভাব করে কথা গুলো
ছুঁড়ে দি’।
এরপর বেশ
কিছুক্ষণ বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন। তারপর পদ্মকোরকের মতো ফুটতে ফুটতে বললেন, আমাদের
একটা বাড়ি ছিল। আমাদের একটা স্কুল ছিল। আমার মনে পড়ে স্কুল যাবার সময় বাঁ-দিক থেকে
একটা পাহাড় আর ডান দিক থেকে একটা নদী আমার সঙ্গে নাগাড়ে গল্প করে যেত। আমার কাঁধে
ব্যাগ, যে ব্যাগে পড়ার বইয়ের সঙ্গে থাকত আমার প্রিয় গল্পের বই “চাঁদের পাহাড়”। আমি বিভূতিভূষণের “অপু”র দৃষ্টি নিয়ে আমার চারপাশের পৃথিবীকে
দেখতাম, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাবার চেষ্টা করতাম।
বৃদ্ধের
কথা বলার ভঙ্গিতে অবাক বিস্ময়ে মুগ্ধ আমি বলে উঠি, বলুন, বলুন, তারপর?
বৃদ্ধ
একটু দম নিয়ে আবার বলা শুরু করলেন, আমাদের কলেজ ছিল বাড়ি থেকে অনেক দূরে। মনে আছে
সাইকেলে চড়ে কলেজে যেতাম। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়... চাকরি...সংসার...আমার স্ত্রী...আমার
ছেলে...। সে দিনগুলোতে আমার নিজেকে মনে হত পাহাড় আর আমার সন্তানকে মনে হত নদী...সে
নদী রোজ পাহাড়ের গায়ে মাখামাখি হয়ে থাকত। আহ্, সে ছিল এক সুখের দিন। তারপর একদিন নদীরও
সংসার হল...উপনদী এল ...শাখানদী এল...তারপর...নাহ্, আর কিছু মনে পড়ছে না।
বৃদ্ধ
দু-হাত দিয়ে তাঁর মাথা চেপে ধরেন। আমি বুঝতে পারি বৃদ্ধের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও
স্বার্থপরের মতো বললাম, সব কথা মনে করার
চেষ্টা করুন, আপনাকে মনে করতেই হবে। আমি
আপনার বাড়ি খুঁজে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসব। বলুন, বলুন, তারপর?
আমার অমন
উত্তেজিত কথা-বার্তাতেও কোনও কাজ হল না। বৃদ্ধ আবারও বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে,
যেন অনেক দূর থেকে কেউ কথা বলছেন এমনভাবে বললেন, সত্যি বলছি আমার আর কিছু মনে পড়ছে
না।
আমি একটু
দমে গেলাম। বুঝতে পারছিলাম এরপর প্রশ্ন করলে সব আবোল-তাবোল উত্তর আসবে। তাই আর
প্রশ্ন করিনি। বলেছিলাম, ঠিক আছে, আমি আজ চলি। ভালো থাকুন। বাড়ি ফেরার পথেও বৃদ্ধর কথা, তাঁর কথা বলার
ভঙ্গি, সব মাথার মধ্যে ঘুরছিল। এ কথা ভেবে ভালো লাগছিল যে, আমার অনুমান সঠিক। ওই
বৃদ্ধ কিছুতেই ভবঘুরে হতে পারেন না।
সেদিনের
পর আরও অনেকবার চেষ্টা করেছি বৃদ্ধর মুখ থেকে আরও কিছু তথ্য বের করে আনার। পারিনি।
কোনও কোনও দিন ওই নদী, উপনদী, শাখানদী আর পাহাড়ে এসে থেমে গেছি, আবার কোনও কোনও
দিন তাঁর অতীত নিয়ে তাকে একটা কথাও বলাতে পারিনি।
বৃদ্ধ
দুপুরে বা রাতে কী খেতেন জানি না। কীভাবে তাঁর খাবার জুটত তাও জানি না। অনেক সময় তাঁকে
দেখতাম বিড়ি-মুখে বেশ চিন্তামগ্ন তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। একদিন কী মনে হল, একটা
গোটা সিগারেট দিলাম সেই বৃদ্ধকে, সঙ্গে আগুন। বৃদ্ধ সে কী খুশি। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে
তিনি বললেন, জানো, শুয়ে থাকলেই পাহাড় নিজেকে চিনতে পারে, খুঁজে পায় তার জীবনের
প্রকৃত সার-সংক্ষেপ। তাই আমি সময়-সুযোগ পেলেই শুয়ে থাকি।
খেয়াল
করেছি বৃদ্ধ তাঁর কথাবার্তায় যে ধরণের শব্দ ব্যবহার করেন তা সাধারণ কথোপকথন থেকে
একেবারেই আলাদা। এবারেও তাঁর হেঁয়ালির অর্থ ধরতে না পেরে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই
কলকাতা শহরে আপনি পাহাড় কোথায় পেলেন?
-
আছে, আছে, এখানেও পাহাড় আছে। তবে মহানগর
বলে কথা, তাই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হয় লোক-লজ্জার ভয়ে। মানে সে আছে কিন্তু নেই আর
কী। বৃদ্ধ আমার জন্যে এক কঠিন ধাঁধাঁ ছেড়ে রাখেন।
-
কী যে সব বলেন না, বুঝতে পারি না।
বুঝতে পারছি আপনি আজকে ভালো মুডে নেই। পরে একদিন এ ব্যাপারে কথা বলব। আমি আলোচনা
থামাতে মনোযোগী হই।
-
তুমি কখনও ফুটপাথে শুয়ে তোমার
চারপাশের পৃথিবী দেখার চেষ্টা করেছ? বৃদ্ধ নাছোড়।
-
নাহ্, দেখিনি।
-
সে জন্যেই জানতে পারলে না মাথার
উপরে থাকা কত ইলেকট্রিক তার মাটির নিচে চলে গেল। বুঝতে পারলে না ফোঁটা বৃষ্টি আর
গোটা বৃষ্টির ফারাক। ছেলেবেলার বইতে পড়া পুরুষ চড়াই আর মেয়ে চড়াইয়ের পালকের
আলাদা-আলাদা রঙ কখনও মিলিয়ে দেখার সময় পেয়েছ? তোমাকে কখনও কেউ কি এভাবে ভাবাতে
পেরেছ যে, শাখানদী তোমার সম্পত্তি, কিন্তু উপনদী আসলে অন্যের?
খেয়াল
করলাম কথা বলতে বলতে বৃদ্ধের চোখ-মুখে বদলে যাছে। আগেও দেখেছি এমন গভীরতরো কথা
বলার সময় ওনার বলিরেখাগুলো ত্রিশূলের আকার ধারণ করে। তাঁর ওই রূপের মুখোমুখি হয়ে মোহগ্রস্থ
আমার মুখ দিয়ে আপনিই বেরিয়ে আসে, আপনি সত্যিই প্রাজ্ঞ পুরুষ, আপনাকে প্রণাম।
আমার কথা
শুনে বৃদ্ধ হঠাৎ উত্তেজিত, প্রবল উত্তেজিত। সেই উত্তেজনার বশেই তিনি বলে চলেন,
-
প্রাজ্ঞ? কীসের প্রজ্ঞা? তুমি
জানো, আই হ্যাড টু স্পেয়ার মেনি অ্যা স্লীপলেস নাইটস...
এই
পর্যন্ত বলেই বৃদ্ধ আবার কথা হারিয়ে ফেলে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন
আমার দিকে। বুঝতে পারলাম ওনার স্মৃতি আবার
কোমাতে চলে গেছে।
এরপর
ওনাকে আর কিছু প্রশ্ন করা মানে - উনি হয় উল্টোপাল্টা বকা শুরু করবেন, নয় একদম চুপ
করে যাবেন। তাই ওঁকে আর বিরক্ত না করে হাতে আরও একটা সিগারেট গুঁজে দিয়ে কেটে
পড়েছিলাম।
মোদ্দা
কথা ওই বৃদ্ধকে নিয়ে আমার সখের রিসার্চ বারবার এসে থেমে গেছে তাঁর ওই ফ্যালফ্যালে
দৃষ্টির সামনে। বহুবার ভেবেছি, নাহ্, আর যাবো না ওই বৃদ্ধের কাছে। পারিনি। সাতদিন
পরেই আবার ফিরে গেছি তাঁর কাছে। আমার কেন জানি না মনে হয়েছে, ওঁর সম্বন্ধে সবটা
জেনে ওঁকে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে আসাটা আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
এদিক
থেকে আমার তথাকথিত সখের রিসার্চকে দ্বিতীয় জন যিনি আলোকিত করেছেন তার নাম রমেশ। সে
আমার খুব পরিচিত এবং বিশ্বস্ত এক রাজমিস্ত্রি। গত অন্তত দশ বছর ধরে ওকে চিনি। রমেশ
এ পাড়ার বিখ্যাত ঠিকাদার রতন স্যান্যালেরও প্রিয়, খুব প্রিয় এক রাজমিস্ত্রিও বটে।
রমেশকে
আমি প্রথম দেখি আমাদের বাড়ি তৈরি হবার সময়। আমার বাবা অবসর গ্রহণ করার পরে কোনও
মতে মাথা গোঁজার জন্যে আমাদের একদা কিনে রাখা জমিতে তখন আমরা চাইছি খুব কম খরচে
একটা একতলা বাড়ি বানাতে। রতন স্যান্যাল যেহেতু একসময় আমার বাবার ছাত্র ছিলেন, বাবা
ধরেই নিয়েছিলেন, “ওখানে”
কিছুটা সুবিধা পাওয়া যাবে।
ডাকা হল
রতন স্যান্যালকে। রতন স্যান্যাল আমাদের তৎকালীন ভাড়া বাড়িতে এসে আমার বাবার পায়ের
ধুলো-টুলো নিয়ে রমেশ নামক জনৈক রাজমিস্ত্রিকে আমাদের বাসায় গুঁজে দিয়ে বলে গেলেন,
ওকেই বলবেন কী করতে হবে, ও-ই সব সামলে নেবে।
রমেশ
সামলে নেওয়ার শুরুর দিনেই আমাকে বলল, যাই বলুন তাপসদা, আপনাদের এখানে রাস্তা এত
ছোট যে এ রাস্তায় লরি ঢোকানোটাই খুব পপলেন।
“পপলেন” শুনে প্রথমটা থমকে গেলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলাম রমেশ
ঠিক কী বলতে চেয়েছে। এ ছাড়া শব্দটা আমার নিজেরও খুব পছন্দ হয়েছিল। তাই রমেশকে
উৎসাহিত করার জন্যে আমিও বললাম, কী রকম পপলেন?
-
খুব পপলেন। আপনাদের বাড়ির ভিতে
কমসে-কম বিশ লরি মাটি ঢালতে হবে। লরিই যদি এই গলিতে ঢুকতে না পারে তো কী করে কী হবে বলুন?
-
ঠিক, ঠিক, খুব পপলেন। কিন্তু কী
করলে এই পপলেন কাটানো যাবে সেটা অন্তত বলো। রতনদা তো বলে গেল, তোমাকে বললেই সব কাজ
ঠিকঠাক হয়ে যাবে। আমি হাসি-মুখে বলি।
রমেশ
কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ঠিক আছে, মাটিটা বড় রাস্তার ধারে
ফেলে তারপর ভ্যানরিক্সা দিয়ে টেনে আনলেই হবে আর তার জন্যে পয়সা খরচ করতে হবে। সে
খরচ করতে আপনার আপত্তি নেই তো?
-
না, না, আপত্তি কীসের? খরচ তো করতেই
হবে। বাব্বা, রতনদা তো দেখছি ঠিক লোককেই পাঠিয়েছে আমাদের জন্যে। আমি রমেশকে উৎসাহ
জোগাই।
-
আসলে কী জানেন তাপসদা, আমাকে “হেল” করার তেমন কেউ নেই। নইলে আমি আরও অনেক
কিছু করতে পারতাম এই জীবনে।
ওর কথা
শুনে আবারও খুব মজা পাই। বুঝতে পারি আগামি কয়েক দিনে রমেশ আমার শব্দ ভান্ডারকে আরও
সমৃদ্ধ করবে। ওকে বলি, চিন্তা নেই, আমি আছি তোমাকে হেল করার জন্যে।
আমাদের
বাজেট ছিল খুব কম। মানে কোনওমতে মাথা গুঁজবার একটা ব্যবস্থা করা আর কী। তাই খরচের ব্যাপারটা মাথায় রেখে আমরা ঠিক করতে
পারছিলাম না, ঘরের দেওয়াল দশ ইঞ্চি হবে নাকি পাঁচ ইঞ্চি। এবং আমরা এ ব্যাপারে
রমেশের মতামত চাইলাম। রমেশ সব শুনে-টুনে আমার মা-কে বলল, দেখুন মাসীমা পাচ ইঞ্চি
আর দশ ইঞ্চির খরচে খুব একটা ডিফেক্ট নেই। মা হতবাক। আমি সামলানোর জন্য বললাম, ঠিক
আছে ডিফেক্ট যখন নেই, তখন দশ ইঞ্চিই ভালো। মা বোধহয় অবস্থাটা অনুমান করতে
পেরেছিলেন, ফলে তিনিও চুপ করে যান। এরপরেও রমেশ তার মাসীমাকে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে
টিউবওয়েল জ্যাম হয়ে গেলে কীভাবে তেল দিয়ে “ছিলিপ” করে নিতে হয় শিখিয়েছে। সেই তখন থেকেই আমি মোটামুটি ওর ফ্যান। ফলে
রাস্তাঘাটে দেখা হলে এই সহজ-সরল রমেশের সঙ্গে অন্তত দশ মিনিট আমি গল্প করে নি।
হ্যাঁ, প্রায় প্রতিদিনই আমি কিছু না কিছু শিখি ওর থেকে, আজও।
মাঝে খবর
পেলাম রমেশ বিয়ে করেছে। যাকে বিয়ে করেছে সেই মেয়েটা নাকি রমেশের “যোগাড়ে”র কাজ করত। মোদ্দা কথা, রমেশের কাজের
সময় ইঁট, বালি, সিমেন্ট এগিয়ে দিতে দিতেই আজ সেই মেয়ে রমেশের ঘরে। খবরটা পেয়ে খুব
ভালো লাগল। মনে মনে বললাম, ওরা ভালো থাকুক, সুখে থাকুক।
এক
রবিবারের সকালে বাজারের পথে রমেশের সঙ্গে দেখা। সেই সহজ, সরল একগাল হাসিমাখা
রমেশকে বললাম, এ বার তো “হেল” করার লোক পেয়ে গেলে রমেশ। রমেশের আবার একগাল হাসি।
তারপর আশেপাশের কেউ যেন শুনতে না পায় এ ভাবে বলল, “বুঝলেন তাপসদা,
এ লাইনে বিয়ে ব্যাপারটা এ রকমই হয়”। “তাই নাকি? বেশ ভালো ব্যাপার তো।“ আমি রমেশকে
উৎসাহ দি’ ওর কাছ থেকে আরও কিছু শিখে নেবার জন্যে।
-
ওকে আগে বলতাম, ইঁট নিয়ে আয়, বালি
নিয়ে আয়, এখন বলি, ভাত নিয়ে আয়, ডাল নিয়ে আয়, খেতে দে। রমেশ হাসে।
-
তোমার বউয়ের নাম কী? আমি জানতে
চাই।
-
মল্লিকা। আমি ডাকি মলি । রমেশ চোখে-মুখে
লজ্জা নিয়ে বলে।
-
বাহ্, সুন্দর নাম। কিন্তু তোমার
মলি কি বিয়ের পরেও যোগাড়ের কাজ করছে নাকি?
-
এখন ক’দিন ওকে ছুটি দিয়েছি। তবে কাজ তো ওকে করতেই হবে। নইলে আমাদের পেট চলবে
না। রমেশের স্পষ্ট কথা।
-
ভালো, বেশ ভালো। ঈশ্বরের কাছে
প্রার্থনা করি তোমরা ভালো থাকো। আমি হাসিমুখে বলি।
এরপর
অজস্র বার রমেশকে দেখেছি কাজে যাচ্ছে বা আমাদের পাড়ার কোনও বাড়িতে কাজ করছে। একা।
হ্যাঁ, একা। সঙ্গে ওর “মলি”কে কখনও
দেখিনি। ভাবলাম, রমেশের একার আয়েই বোধহয় ওদের যথেষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাই ঘরের বউকে
ঘরেই রেখেছে ও। কিন্তু বেশ কিছুদিন পর এদিক-সেদিক থেকে কানাঘুঁষোয় রমেশের বউ
সম্বন্ধে যা শুনলাম তাতে মনটা খারাপ হয়ে গেল। শুনলাম রমেশ কাজে বেরলে নাকি ওর ঘরে
পৌছে যায় রতন স্যান্যাল। শুনলাম, সে জন্যেই রমেশের “মলি”কে আর কাজে বেরতে হয় না। ইঙ্গিতটা এ ক্ষেত্রে পরিষ্কার! এ সব কথা
বিশ্বাস করতে মন চাইত না। প্রার্থনা করতাম, রমেশের মত অমন সাধাসিধে ছেলের জীবনে
এমন অভিশাপ যেন না নেমে আসে।
তবু “ভদ্রলোক সুলভ” কৌতুহল থেকে একদিন অফিস থেকে
ফেরার পথে রমেশের সঙ্গে দেখা হতেই এ কথা, সে কথার পর জিজ্ঞেস করে ফেললাম, রমেশ, তুমি
বলেছিলে তোমার বউ তোমার সঙ্গে কাজ করবে। কই তাকে তো দেখি না।
-
না তাপসদা, তাকে বেরতে হয় না। সে
ঘরেই থাকে। রমেশ জানায়।
-
ভালো, ভালো। তোমরা ভালো থাকলেই
ভালো।
আমার কথা
শুনে রমেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল কিছু একটা বলতে চাইছে আমাকে,
অথচ বলবে কিনা বুঝতে পারছে না। আমিই নীরবতা ভাঙলাম। বললাম, রমেশ, আমি চলি।
-
না দাদা, যাবেন না। আপনার সঙ্গে
একটা কথা ছিল।
-
কী কথা, বলে ফেল। আমি অবস্থাটা
স্বাভাবিক করার চেষ্টা করি।
-
তাপসদা, আপনি তো জানেন যে, আমার
মালিক আমার কাছে ভগবান। রতনের গলায় আমি আবেগ টের পাই।
-
স্বাভাবিক। রতনদা তোমার এতদিনের
মনিব। আমি ওর কথায় সায় দি’।
-
দাদা, সে জন্যেই তো আমার মালিক রোজই
একবার আমার বাড়িতে আসে। রমেশের গলা যেন কিছুটা ক্ষীণ হয়ে বাজে।
-
সে তো আসবেনই। তোমার সঙ্গে কাজ
নিয়ে আলোচনা করতে আসে নিশ্চয়ই? আমি ভালোমানুষের মতো মুখ করে বলি।
-
না দাদা, আমার মনিব আমার কাছে আসে
না। আমি কাজে বেরনোর পর সে আসে আমার বউ মলির কাছে। প্রতিদিন।
-
সে কী, কেন? আমি নাকে একটা পোড়া
গন্ধ টের পাই।
-
দাদা, আমার বউয়ের বাচ্চা হবে।
রমেশ যেন খুব দ্রুত এক প্ল্যাটফর্ম থেকে আরেক প্ল্যাটফর্মে পৌছে দেয় আমাকে।
আমি
রমেশের সরল কথোপকথনের আড়ালে থাকা ঘামের দাগটা টের পাই। কিন্তু ওকে কিছু বুঝতে না
দিয়ে বলি,
-
আরে এ তো দারুণ খবর। মিষ্টি তুমি
খাওয়াবে নাকি আমি?
-
দাদা, ও বাচ্চা বোধহয় আমার না। দুম
করে কথাটা বলেই রমেশ আমার মুখের দিকে তাকায়। সরাসরি।
এমন একটা
পরিস্থিতির জন্য আমি আদৌ তৈরি ছিলাম না। এ অবস্থায় ঠিক কী বলা উচিৎ আমি বুঝতে
পারছিলাম না। একবার ভাবলাম কথা আর না বাড়িয়ে কেটে পড়ি। আবার ভাবলাম, এ ভাবে চলে
যাওয়াটা ঠিক দেখায় না। তাই চোখ-মুখ যথাসাধ্য সহজ রেখে বলেই ফেলি, সেকি, তবে ও
বাচ্চা কার?
-
আজ থাক দাদা। আমি চলি।
রমেশ
আমাকে আর কথা বলার সুযোগ দিয়ে চলে যায়। আমি এবার আর শুধু পোড়া গন্ধ নয়, সঙ্গে মূল
আগুনটাও যেন দেখতে পাই এবং তার উত্তাপ টের পেতে থাকি।
বাড়ি ফেরার
পথে রমেশের কথাগুলো আমার মাথার ভিতরে দৌড়াদৌড়ি করছিল। ঠিক করে নিয়েছিলাম,
নাহ, অনেক হয়েছে আর নয়, এবার থেকে ওর
সঙ্গে রাস্তাঘাটে দেখা হলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করব।
সে
প্রতিজ্ঞা রেখেছিলাম অন্তত মাস ছয়েক। রমেশের সঙ্গে দেখা হলে, কখনও শুধু হাসি, কখনও
একটু ঘাড় নেড়ে চলে যেতাম। রমেশও কি বুঝেছিল কে জানে, আগের মতো আর আন্তরিক আলাপের
আগ্রহ দেখাত না।
ভালোই
চলছিল। এবারেও একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে প্রবল বৃষ্টি। আমি একটা গ্যারাজে শরীর
গলিয়ে দিয়ে শরীরটা টানটান করতে গিয়ে দেখি, আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে রমেশ। বুঝলাম
সেও বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছে ওই গ্যারাজে। খেয়াল করলাম আমাদের আশে-পাশে আর
কেউ নেই। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়াব নাকি কেটে পড়ব, ভাবতে ভাবতেই, যেন সেই পুরোনো রমেশ,
হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে গেছে, এমন ভাব করে
বলে, তাপসদা, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল।
-
কী কথা বলো। আমি যথাসাধ্য
সংক্ষিপ্ত হবার চেষ্টা করি।
-
না, ভাবছি আপনাকে জিজ্ঞেস করা ঠিক
হবে কিনা। রমেশ আমতা আমতা করে।
-
ইচ্ছে না হলে বোলো না। আমি
গাম্ভীর্যের আড়ালে নিজেকে মুড়ে দেবার চেষ্টা করি।
আরও
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আক্ষরিক অর্থেই বেশ বিব্রত দর্শন রমেশ বলে, তাপসদা, আমাকে
একজন বলল যে, রাজস্থানে বেড়াতে আসা এক মেমসাহেব নাকি বিয়ে করেছেন ওখানকার এক
রিক্সাওয়ালাকে। কথাটা কি সত্যি?
-
হ্যাঁ, কথাটা সত্যি। কিন্তু হঠাৎ
এ কথা কেন? আর তো্মাকেই বা এ কথা কে এবং
কেন বলতে গেল? ভদ্রলোক-সুলভ কৌতুহল আমার অজান্তেই আমাকে আবার গলি থেকে বের করে
আছড়ে ফেলে খিড়কির পুকুরে।
-
তাপসদা, আপনাকে আমার খুব ভালো
লাগে। আপনাকে বলতে পারি সব। আপনি কাউকে বলবেন না তো?
-
না, না, তোমার কথা অন্য কাউকে বলব
কেন? আর তোমার অসুবিধা থাকলে বলার দরকার নেই। আমি আসলে রমেশের কথায় অন্য গন্ধ পেয়ে
একটু যেন ভয় পেয়ে যাই আর সে কারণেই আবার তাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি।
-
দাদা, আমাকে কথাটা বলেছে সন্ধ্যা
বৌদি, আমার মালিক রতন স্যান্যালের বউ।
রমেশের
উত্তরে আমি আবারও জটিল কিছুর আভাষ পাই। ফলে “ভদ্রলোক” আমি সে জটিলতা এড়ানোর জন্যে শুধু, “হুম, ঠিক
আছে, পরে কথা হবে” বলে বৃষ্টির মধ্যেই পা বাড়ানোর চেষ্টা
করি বাড়ির দিকে। তার আগেই শুনতে পাই রমেশের ডাক, তাপসদা, আপনাকে আরও কিছু কথা বলার
ছিল। ওর ওই ডাকে যে আর্তিটা ছিল তাকে উপেক্ষা করতে পারলাম না। তাই বাধ্য হয়ে একটু
বিরক্ত মুখেই ফের জিজ্ঞেস করি, বলো, তোমার আর কী বলার আছে।
-
দাদা, বৌদিরও বাচ্চা হবে। রমেশ
হাল্কা ছুঁড়ে দেয় কথাটা।
এবার
মাথা বেশ গরম হয়ে যায়। কে না কে ওর বৌদি, তার বাচ্চা হবে আর সেটা রমেশ আমাকে
জানাচ্ছে। বেশ রাগত গলায় বললাম, কে বৌদি? জানি না, চিনি না! তার বাচ্চা হবে তো
আমার কী?
-
দাদা, এই বৌদি হল সন্ধ্যাবৌদি,
মানে আমার মালিকের বউ।
-
হুম, বুঝলাম। আমি দায়সারা উত্তর
দি’
-
দাদা, মনিবের বউও আমার ভগবান। আমি
তার কোনও কথায় না করি না।
-
সেটাই স্বাভাবিক। আমি সংক্ষেপে
পাশ কাটানোর চেষ্টা করি।
-
দাদা, জানেন, বৌদির পেটের বাচ্চাটা
কিন্তু আমার মালিকের না।
রমেশের
শেষ বাক্যটা স্তম্ভিত আমাকে টেলিভিসনে দেখা সুনামির মুখ দেখিয়ে যায়। এরপর আর একদমই
দাঁড়ানো চলে না। ভিতরে-ভিতরে আমার তখন একটা ভয় কাজ করতে শুরু করেছে। নিজেকে তখন
অভিশাপ দিচ্ছি, এ ভাবে এইসব কথার মধ্যে জড়িয়ে পড়ার জন্য। এ সব কথা জানাও বিপদের। আমি
তাই আর একটাও কথা না বলে এবার দ্রুত পায়ে হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে।
সে রাতে
ভালো করে ঘুমোতে পারিনি। তবু যেটুকু ঘুমোতে পেরেছিলাম তার মধ্যেই রমেশ আর তার
আপাত-সরল ধাঁধাঁগুলো বিধ্বস্ত আমার ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নে বারবার উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল।
সেই থেকে
“সখের রিসার্চ” থেকে শত হস্ত দূরে থাকা আমি আজ অফিস-ফেরত খুব দ্রুত পায়ে বাড়ি
ফিরছিলাম এমন সময় হঠাৎ কানে এল সেই পরিচিত গলা, “একটা
সিগারেট হবে নাকি”? আড়চোখে দেখলাম আমার পরিচিত ফুটপাথবাসী
সেই বৃদ্ধ ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছেন আমার দিকে। ভেবেছিলাম, এক মুহূর্তও দাঁড়াব না।
তবু এভাবে এড়িয়ে যাওয়াটা ঠিক দেখায় না ভেবে বৃদ্ধের মুখের দিকে একবার ভালো করে নজর
বোলাতে গিয়ে দেখি আজ ওনাকে যেন একটু অন্য রকম দেখাচ্ছে। তা সত্বেও আমার মনে হলো,
নাহ, আর সখের রিসার্চ নয়। অনেক হয়েছে। এবার এই বৃদ্ধ আর রমেশ দু’জনকেই এড়িয়ে চলতে হবে।
নেহাৎই
মায়া পড়ে গেছে বলে তবু একটা সিগারেট সে বৃদ্ধর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, কিছু মনে
করবেন না, আজ একটু তাড়া আছে, আমি চললাম। পরে কথা হবে।
-
কম্-সে-কম্ আগুনটা তো দিয়ে যাও।
বৃদ্ধর আবদার।
ওখানে আর
দাঁড়াব না ঠিক করে নিয়েছিলাম বলেই অনেকগুলো কাঠি সমেত একটা গোটা দেশলাই বাক্স সেই
বৃদ্ধর হাতে তুলে দিলাম।
দেশলাই
বাক্সটা হাতে নিয়ে বৃদ্ধ হঠাৎ বললেন, একটু দাঁড়াবে প্লীজ।
অমন
বয়স্ক একজন এভাবে দাঁড়াতে বললে, না দাঁড়িয়ে চলে যাওয়া যায়? দাঁড়ালাম। বললাম, বলুন
কী বলছিলেন।
-
তুমি এভাবে চলে যাচ্ছ কেন? আমি কি
না জেনে কোনও অপরাধ করে ফেলেছি?
-
আরে না, না, সে সব কিছু নয়। আমার
আসলে আজকে একটু তাড়া আছে। তাই আর কী...। আমি কৈফয়েত দেবার চেষ্টা করি।
বৃদ্ধ
হাসলেন। বেশ বুঝতে পারছিলাম, সে হাসি বড় কষ্টের। সে জন্যেই কিনা জানি না, আমি বলে
ফেললাম, সব সময় দেখেছি আপনি খুব হাসিখুশি থাকেন। আজ কিন্তু আপনাকেও বেশ অন্য রকম
দেখাচ্ছে।
-
অন্য রকম দেখাচ্ছে? কী রকম? বৃদ্ধ
যেন বহু কষ্টে উচ্চারণ করেন কথাগুলো।
-
আজ যেন মনে হচ্ছে, আপনি ক্ষয়ে
যাচ্ছেন। কেন যে কথাটা বললাম, আমি নিজেও জানি না।
-
তুমি ঠিকই বলেছ। ওই ক্ষয়ে যাওয়াই
আসল আমি। আসলে পাহাড়, সে যত বড়ই হোক, জানবে প্রতিদিন তার ক্ষয় আছে।
-
সে ক্ষয় তো প্রত্যেকেরই আছে। আমার
আছে, আপনার আছে...। আমি বিতর্কে ঢুকে পড়ি।
-
তুমি ঠিকই বলেছ। তবে এ ক্ষয়
আলাদা। এ ক্ষয় সময়ের খাজনা মেটানো ক্ষয় নয়। এ হলো আদরে ক্ষয়ে যাওয়া। বৃদ্ধ কেটে
কেটে বলেন।
-
আদরে ক্ষয়ে যাওয়া? কী রকম? আমার বুকের ভিতরে একটা অদ্ভুত ধুকপুকানি টের পাই
আমি।
-
এমন তো অনেক দেখেছ যে পাহাড়ের পায়ে
প্রতিদিন আছড়ে পড়েছে নদীর জল। মাথা উঁচু পাহাড় আর তার পা ধুইয়ে দিচ্ছে নদী
প্রতিদিন, এমন দিবারাত্রির কাব্য এ দেশেই অনেক পাবে। থাক সে কথা। তোমাকে আর আটকাবো
না। তুমি যাও। বুঝতে পারি, তোমাকে বড্ড বিরক্ত করে ফেলি মাঝে মাঝে। প্লীজ কিছু মনে
কোরো না। দীর্ঘ সংলাপের শেষে বৃদ্ধ হাঁপাতে থাকেন।
-
আমার যতই তাড়া থাকুক, আজ আপনার
কথা না শুনে আমি এখান থেকে নড়ছি না। আমি কঠিন প্রতিজ্ঞার মতো কথাগুলো ছুঁড়ে দিলাম।
বৃদ্ধ
আবারও হাসলেন। তারপর কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন। আমি ভাবলাম, গেল, আবার
বোধহয় বৃদ্ধর মননের লোডশেডিং হয়ে গেল। মানে আবার সেই শেষ পাতার আগের পাতায় এসে
থেমে যাওয়া। হতাশ আমি উঠে পড়ব পড়ব করছি,
ঠিক সে সময় বৃদ্ধ অনেকটা স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন,
-
এটা তো মানো যে, নদী যখন পাহাড়ের
পা ধুইয়ে দেয়, তাতে ভালোবাসা থাকে, আবেগ থাকে।
-
থাকে তো। আমি সমর্থন যোগাই
বৃদ্ধকে।
-
কিন্তু তার বাইরেও কিছু থাকে যেটা
আমরা জানি কিন্তু সেভাবে অনুভব করি না, খালি চোখে দেখতে পাই না বা চাই না। সেটা কি
কখনও ভেবে দেখছ? বৃদ্ধ আমার চোখে-চোখ রেখে থামেন।
-
সেটা কী? আমি ভিতরে ভিতরে প্রবল
উত্তেজনা অনুভব করি।
-
ক্ষয়।
-
ক্ষয়? কীসের ক্ষয়? কার ক্ষয়? আমি
একটানা প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দি।
-
পাহাড়ের ক্ষয়। নদী তার ভালোবাসা
আর ভক্তি দিয়ে প্রতিদিন পাহাড়ের পা ধুইয়ে দেয়। নদীর অমন আদরে তলে তলে পাহাড়ের
ক্ষয়ে যাওয়াটা আমাদের আবেগী চোখ সেভাবে দেখতে দেয় না। জানবে, এমনকী পাহাড় নিজেও ওই
ভালোবাসা আর আদরের কাছে নিজেকে এমনভাবে সমর্পণ করে যে নিজেও তার এই তলে তলে ক্ষয়ে
যাওয়াটা সহজে টের পায় না।
বৃদ্ধের
অমন গভীরতরো উপলব্ধির কথা শেষ হবার পর আমার চারপাশে তাকিয়ে দেখি সমস্ত কিছু, মায়
অন্ধকারও কীভাবে যেন ক্রমশ ধূসর হয়ে যাচ্ছে। আমি কফি হাউসের বাদামী বিকেল দেখেছি,
কিন্তু অন্ধকারের এমন রঙবদল এর আগে আমার চোখে কখনও পড়েনি।
ছড়িয়ে
থাকা সেই ধূসর অন্ধকারে আজ ফুটপাথ ঘেঁষা দেয়ালে হেলান দিয়ে একজন প্রাজ্ঞ মানুষ একমনে
বিড়বিড় করে যাচ্ছেন, “She stood by the window and looked out dully at a
grey cat walking a grey fence in a grey backward”।
ঠিক এই
সময়েই কেন জানি না আমার মনে পড়ল রমেশের কথা। মনে হল দূরের ধূসর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে
রমেশ হাসছে আর বলছে, তাপসদা, বলেছিলাম না – আমাকে হেল করার কেউ নেই...
No comments:
Post a Comment