তন্ময় ধর

নীল সরস্বতী এবং অনন্ত বসন্তের পৃথিবী

১।

নদীই। তার অর্ধেক বরফ। নুড়িপাথরের ছটফটানিতে শীতকাল যেখানে শেষ হচ্ছে, সেখানেই একদল যাযাবর মানুষ মুখোশ নৃত্য শেষ করে স্নো লায়ন ড্যান্সের শুরু করতে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহুর্তে আমাদের নায়িকা নিরুদ্দেশ হবেন। খাতায়-কলমে নিরুদ্দেশ বলতে যা বোঝায়, এটা ঠিক সেরকম নয়। চলমান প্রতিবিম্বটা শেষ হয়ে যাবে ওখানে। কালপুরুষের কোমরের মধ্যস্থলের নক্ষত্রের রঙ অস্পষ্ট হয়ে যাবে। একটা ফোন আসবে নায়কের কাছে। বর্ণনা শুনে এঁকে ফেলতে হবে বজ্রযান বৌদ্ধতন্ত্রের তারা এবং অমিতাভের সঙ্গম মূর্তি।
‘না। এভাবে নয়। দাঁড়াও, আমি তোমার কাঁধে আমার বাঁ পা তুলে দিই’
‘পৃথিবী তো কাঁপছে, দেবী’
‘শ-শ-চুপ’ ঠোঁটের ধারণায় উষ্ণ আঙুল ‘এখন শুধু রঙের শব্দ শোনো...’
‘রঙ ধরে রাখা যাচ্ছে না...’
‘আহ, কথা বোলো না...’
অন্তহীন একটা সম্পর্কের কথা শুরু হয়ে যায়। যেটা জন্ম-পুনর্জন্ম, চিরদিন-চিররাত্রি পার হয়ে শেষ হয় না। সোনালী আলোর উষ্ণতা বাড়ে। বরফ গলে যায়। যাযাবর মানুষের দল হারিয়ে যায়। নদীতীরের বালিমাখা পায়ের ছাপ থেকে উড়ে যায় পরিযায়ী হংসধ্বনি।
‘কেমন আছো গো? সেই জন্মান্তরের সোনালী আলোর কথা মনে পড়ে?’ নায়িকা ঝুঁকে পড়েছে স্মৃতিভ্রংশ নায়কের মুখের ওপর। একটু পরেই ক্লিনিক্যাল মৃত্যু শুরু হবে।
‘একটু পরেই স্নো লায়ন ড্যান্স শুরু হবে’ সামান্য নড়ে ওঠে নায়কের ঠোঁট।
‘আমাকে নিয়ে যাবে? প্লিজ, প্লিজ, আমাকে নিয়ে যাবে?’
উত্তর আসে না। প্রতিবিম্ব সরতে থাকে। আরো সরতে থাকে। নায়িকা নদীর তীরে সেলফি তুলতে গিয়ে চমকে ওঠেন। কুয়াশার ভিতর থেকে স্নো-লায়ন ড্যান্সের বাজনা একবার বেজে উঠেই থেমে গেল।
‘আর ইয়্যু শ্যিওর? নায়ক সত্যিই মারা গিয়েছেন?’ ডিরেক্টর ক্যামেরা জুম করতে থাকেন নায়িকার মুখে। প্রতিটি রোমকূপ, শিরা, উপশিরা পাথুরে হয়ে উঠছে ক্রমশ।
‘স্যর, এখনই কি এই প্রশ্নের উত্তর দরকার?’ ইজি-চেয়ারে এলিয়ে পড়েন নায়িকা ‘মেক-আপ ম্যানকে একবার ডাকুন। আজ মেক-আপ এত বেশী করেছে যে কথা বলতে গেলেও অস্বস্তি হচ্ছে...’
কোথা থেকে একটা গান ভেসে আসছে ‘...যেই না দ্যাশে যাইবারে তুমি সেই না দ্যাশে যাব আমি গো/ খঞ্জন পক্ষী হইয়া... বন্ধু রে... সোনা বন্ধু রে... করব আমি দ্যাখা গো/ সোনা বন্ধু রে, কোন দোষেতে যাইবা ছাড়িয়া...’
সব আলো নিভে যায়। নায়িকার মৃত খোলস নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন ডিরেক্টর। কালপুরুষের ঊরুসন্ধির নক্ষত্র থেকে উল্কাবৃষ্টি শুরু হয়। ঠিক এইখানেই পুনর্জন্ম শুরু হচ্ছে নায়কের। অন্য একটা শরীরে মাত্রাতিরিক্ত শ্যুগার প্রোফাইল নিয়ে গার্লস হোস্টেলের বারান্দার কাছে চলে এলেন নায়ক। সন্ধ্যাতারাটি টুপ করে নায়িকা হয়ে যায়। প্রথম কান্নার ভিতরে শিখতে থাকে চুম্বন। চোখ খুলতেই এক লাফে অর্ধ যুগ পেরিয়ে যায়। অপমানিত দু’গালের নখের দাগে জল নেমে আসে। ভোরের স্বপ্ন থেকে লাফিয়ে ওঠে আত্মহত্যা। কখন শুরু হবে সোনালী আলোর সংলাপ?
শুরু হয়ে গিয়েছে, দেবী। দ্যাখো, আমার এই মুঠির ভেতরে আমার সংসার ভেঙে যাচ্ছে। শাদা আঠালো সংসার। অনুভবহীন উত্তেজনাহীন...’
‘কিন্তু, আমি তো সরে যাচ্ছি...’
‘বন্দিনী নীল সরস্বতী, এককালে তুমি নাকি উর্বরতার দেবী ছিলে! এখন এমন অসার করে দিচ্ছো কেন আমায়?’
‘আমি এককালে মৃত্যুরও দেবী ছিলাম’ হেসে উঠতে যান নায়িকা। কিন্তু নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে।
ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গহন শীতে বরফের দানার ভেতর গুটিয়ে যায়। তার ভেতর গুটিয়ে যায় সংসার এবং অসমীকরণ। নায়ক এবং নায়িকা ঠিক করেন, এরপর আর কোন শীতের দেশে দেখা করা যাবে না।
২।
মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। উষ্ণ বৃষ্টির দেশে স্নো লায়ন ড্যান্স শুরু করল সেইসব যাযাবর মানুষেরা। ঠিক তার পাশে শহুরে শপিং মলে দেখা হয়ে গেল নায়ক-নায়িকার। খাদ্য উৎসবের আয়োজন ছিল সেখানে। নিজের অভিনয় প্রতিভার জন্য সম্বর্ধনা এবং পুরস্কারের ভিড় সামলে চোখের আই-শ্যাডো ঠিক করতে করতে সামান্য হাসলেন নায়িকা ‘কি, আবার বলবে তো, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অসার হচ্ছে। এক একটা অরগ্যান শুকিয়ে যাচ্ছে... আমি এসব পুরনো কথা শুনতে চাই না...’
‘স্যরি’
‘আমি তো অভিযোগ করি নি। তোমায় ডেকেও আনি নি...’
‘পুনর্জন্মের মুহুর্তগুলোর কথা কি তোমার স্মরণে আছে, দেবী?’
‘ওয়েট। আমাকে এখন ব্লাড প্রেসারের ওষুধ খেতে হবে...’
ওষুধ খেতে খেতে ভক্ত ও স্তাবকদের পুষ্পস্তবকের আড়ালে কখন হারিয়ে গিয়েছে উত্তরের অপেক্ষা।
নায়কের মৃতদেহ শপিং মলের ডাস্টবিন থেকে আবিষ্কৃত হয় পরদিন সকালে। কয়েক সপ্তাহ নাকি অনাহারে ছিল সে। শরীরের অনেক ট্যিসু শুকিয়ে গিয়েছিল।
অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত করতে যে পুলিশ অফিসার এলেন তার নাম ইন্দ্র। তার নাকি লুকিয়ে গভীর রাতে কবিতা লেখার এবং মদ্যপানের দোষ রয়েছে। ইন্দ্র ধর্মপত্নী অদিতির ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি কোর্সের ব্যাচমেট।
পুলিশ অফিসারের তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ অদিতির চোখের ফুটোর অনন্ত অন্ধকার দিয়ে সোজাসুজি লাগল নায়িকার গায়ে। প্রথমে সামান্য ক্ষতচিহ্ন তৈরি হল। তারপর সেটা থেকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ক্যান্সার।
শহরের সবচেয়ে দামী হসপিটালটায় ভর্তি হলেন নায়িকা। সাড়ে এগারো ঘন্টার দীর্ঘ সার্জারি। অপারেশন থিয়েটারের পর্দার আড়ালে নাকি নায়কের আত্মার ছায়া ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। সার্জারির পরে নায়িকাকে হাসপাতালের শয্যায় রাখার পরেও সে ছায়া নাকি আরো ঘনীভূত হয়েছে আশেপাশে। প্রিয় পারফিউমের গন্ধে ম-ম করেছে হাসপাতালের ঘর।
অদিতি কিন্তু দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন প্রাণপণ। তদন্তের ফাঁকে ফাঁকে ইন্দ্র তাকে সাহায্য করে চলেছে। ইন্দ্রের ঘ্রাণশক্তির ভেতর বাসি মাংসের অদ্ভুত এক গন্ধ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।
অন্যমনস্ক ছিল ইন্দ্র। হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে তেমাথার কাছে একটা মাটির সরা পায়ে লাগল। অর্ধভুক্ত খাবারে মাখা মাটির সরা। নায়কের মৃত আত্মার উদ্দেশ্যে কেউ রেখে গিয়েছিল পাশের নদীতীরে। কোন কুকুরে টেনে এনেছে ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে। হোঁচট খেয়ে ইন্দ্র পড়ে গেল। পড়ল অসুস্থ একটা কুকুরের ক্ষতবিক্ষত জরায়ুর রক্তের ওপরে। ইন্দ্রের বমি শুরু হল।
ওদিকে অদিতির চোখের সামনে দাঁড়িয়ে একটা অস্পষ্ট মানুষ হাসছে। তাকে ছুঁয়ে দিলে সে নায়ক হয়ে যেতে পারে। তার যৌনাঙ্গের স্মৃতি থেকে অনুভূতিহীন কিছু ছবির রঙ বদলে যাচ্ছে হাসপাতালের দেওয়ালে। নায়িকার জ্ঞান ফিরছে। নায়িকার চিৎকারে অদিতির দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হচ্ছে আরো। নায়কের স্মৃতি ফিরছে।
ডাক্তার অধিকারী ইচ্ছাকৃতভাবে ইন্দ্রকে ভুল ইঞ্জেকশন দিলেন। তার ওপর ওভারডোজ। নায়কের ভ্রূর বাঁদিকের রক্তবর্ণ জড়ুলটা ফুটে উঠল ডাক্তারের মুখে। অদিতি এবং নায়িকার জন্য নতুন ওষুধ বানাতে লাগল অধিকারী।
কিন্তু সে ওষুধে উপাদানগত এবং পদ্ধতিগত ত্রুটি থাকায় অস্বাভাবিক ক্রিয়া শুরু হল। এবং বিকেলের পড়ন্ত আলোয় হাসপাতালের সামনের সেই তেমাথার মধ্যিখানে উপুড় হয়ে পড়ে রইল একটা নারীদেহ। মোবাইলে ফটো তুলতে তুলতে কেউ বলল সেটা নিছকই দুর্ঘটনা। কেউ বলল, সেটা সুইসাইড। কেউ বলল, খুন। তার মাথাভর্তি ভ্রমরকৃষ্ণ চুলের ওপর দ্রুত নামতে থাকল সন্ধ্যের অন্ধকার। কেউ বলল, উনিই নায়িকা। কেউ বলল, উনি অদিতি।


                                                                 (চলবে)

No comments:

Post a Comment