রোহণ ভট্টাচার্য

পার্টনারশিপ



সন্ধ্যের কোচিং-ক্লাস কালো ব্ল্যাকবোর্ডে সাদা চকের দাগ লিখতে লিখতে কিছু দাগ অতিরিক্ত কিছু দাগ অপ্রয়োজনীয় সেইসকল ভুল, মুছে দিচ্ছে, ডাস্টার মুছতে মুছতে সাদা ক্লান্তিহীন বলতে চাইছে : অন্যের খামতি নিজের শ্রম দিয়ে ঢেকে দেওয়াই বন্ধুত্ব সান্ধ্য-আবহাওয়ায় এই ছোঁয়াচে বিশ্বাস ছড়িয়ে দিচ্ছে মানুষ থেকে মানুষে উড়তে থাকা চকের ধুলো, শূন্যে লিখে চলেছে সম্পর্কবানান খালি চোখে সে বর্ণমালা পড়া যায় না শুধু চকের গন্ধ পাওয়া যায় বাতাসে মিশে থাকা চকগুঁড়ো স্বভাবঈশ্বর দেখা না গেলেও, মাঝেমধ্যে অনুভব করা যায়

ওরা কোচিংবেলার বন্ধু দেবা-বুবাই-নন্তু-প্রদীপ চক-ডাস্টারময় পরিবেশে গেঁথে গিয়েছিল সম্পর্কবীজ সেই থেকে সকালে পাড়াক্রিকেট বিকেলে পাড়ায় আড্ডা শিখতে এসেছিল লেখাপড়া শিখেছে জড়িয়ে পড়া একে অন্যের সঙ্গে আমিও কেমন করে যেন ওদের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিলাম খেলার অজুহাতে হয়ত সাক্ষী থাকার জন্যই সমস্ত ঘটনাই তো নিজের জন্য একজন সাক্ষী নির্বাচন করে নেয় ওদের ব্ল্যাকবোর্ড-বইখাতা-পেনপেন্সিল-এর জীবনপ্রবাহও বেছে নিয়েছে আমাকে ক্রিকেট খেলতে এসে রোজই একটু একটু করে ঢুকে পড়েছি অন্য কয়েক জীবনের ভিতর একমাত্র রক্তমাংসের সাক্ষী হিসেবে প্রতিদিন খেলার শেষে আমাদের কার্নিশের তলায় বসে ওদের গল্প শুনে চলেছি দ্বিতীয় সাক্ষী, প্রদীপের সাইকেল ফুটপাথের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রোজ সম্মতিসূচকভাবে একদিকে হেলানো থাকে মাথা যেন সর্বক্ষণ অনুমতি দেয়এইসব কথা দিকে দিকে বিলি করে দেওয়ার, চাউর করে দেওয়ার

তল্লাটের লোকজনের মুখে মুখে ওরা ছড়িয়ে পড়েছে এমনিতেই বাঙালির মেগাসিরিয়াল আর ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থাকার সময় ভরসন্ধ্যেবেলা তখনই অল্পবয়সী চ্যাংড়া ছেলের দল বাড়ির রকে বসে গুলতানি করে যাবে এতে গায়ে ফোস্কা না পড়লেও মনে মারাত্মক ছ্যাঁকা লাগে আধুনিক মানুষ হয়ত বন্ধুহীনতায় এতই জর্জরিত একটা সময় ছিল যখন বাড়ির একতলা মানে রক বা বারান্দা এখনকার অত্যাধুনিক বাড়িতে রক নেই আর সবই ঢুকে গেছে গ্যারেজের পেটে আমারাও এখন যে বাড়িতে থাকি তার একতলায় গ্যারেজঘর আমার বাবা, লক্ষ্মী আর সরস্বতীর মধ্যে দ্বিতীয়জনকেই বেছে নিয়েছিলেন ফলে, আমাদের গ্যারেজঘরে গাড়ির বদলে চেয়ারটেবিল-বইপত্তর এসে তাকে পড়াশুনাঘর বানিয়ে ফেলেছে

ছেলেবেলায় পড়েছিলামশক্তি অবিনশ্বর, এক শক্তি অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত হয় উদাহরণ পেলাম বড়ো হয়ে যখন দেখলাম বাবা বিদ্যাশক্তিকে অর্থশক্তিতে পালটে নেওয়ার চেষ্টায়, গ্যারেজঘরকে টিউশানখানা বানিয়ে ফেলেছেন সাড়ে-আটটা নাগাদ বাবা চেম্বার বন্ধ করে উপরে উঠে আসেন তখনই ওরা চারজন সিগারেট জ্বালিয়ে আমাদের কার্নিশের নিচে পিছনে বড়ো বড়ো করে সাইনবোর্ড লেখা : ম্যাথেম্যাটিক্স এই নিয়েই অভিযোগ ওঠেবাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা সিগারেট খায়, পড়াশুনার জায়গায় আড্ডাবাজি করে, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি অথচ, অঙ্ক ক্লাসের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চারটে ছেলে অদৃশ্য যোগচিহ্ন দিয়ে বেঁধে রাখছে নিজেদের, সে-সব কেউ বলেনি প্রত্যেক সিগারেটের কাউন্টার বদলের সঙ্গে ভগ্নাংশ হিসেবে আত্মা পাল্টাপাল্টি হয়ে যাওয়া, চোখে পড়েনি কারোর মাঝখান থেকে ক্রিকেট ওদের সঙ্গে যোগ করে দিয়েছে আমাকেও

ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছিল নব্বই দশকের কলকাতায় মধ্যবিত্ত আসবাব তালিকায় তখন টেলিভিশান ছিল না এখন সব বাড়িতেই পরিবারের তৃতীয় জানলার মতো আধুনিক টিভি অথচ সেইসময় গোটা পাড়ায় একটা কি দুটো! আমাদের পাড়ার ক্লাবেও, তখন চাঁদায় কেনা টিভি খেলা শুরু হলে ফাঁকা হয়ে যেত রাস্তাঘাট ক্লাবের সামনে শতরঞ্চি বিছিয়ে সাময়িক গ্যালারি জাতি-ধর্ম-বিত্ত ভুলে, ওই দশফুট বাই দশফুট গ্যালারিতে গাদাগাদি হয়ে বসা দর্শক একই হতাশা, একই উচ্ছাস ওই একটি সময়ে সমগ্র দেশ না হোক, স্বদেশি একটা পাড়া আশ্চর্যরকম সেকুলার হয়ে যেত

আমাদের যৌথ পরিবারে একমাত্র টিভি, জেঠুর ঘরে যৌথ পরিবারের নিয়ম মেনেই জেঠুর দরজায় পর্দা ফেলা সারাক্ষণ কমেন্ট্রি শুনলে জেঠুর দুশ্চিন্তা হয়, অতএব টিভিকে বোবা করে রাখা শুধু ফ্যানের হাওয়া মাঝেমধ্যে ফুঁ দিয়ে পর্দাকে নড়িয়ে দিলে বাইরে থেকে চোখে পড়ত সরু ফিতেয় লেখা স্কোরবোর্ড আবার পর্দা নেমে এলে অনন্ত অপেক্ষা বয়ঃসন্ধির অনেক আগেই ক্রিকেট আমাদের শিখিয়ে দিয়েছিল অন্যের জানলায় উঁকি মারার কৌশল

প্রতিবেশি জানলার কাছে ধার করে ক্রিকেট দেখতে দেখতে, বহু ধারদেনা পেরিয়ে, বাবা নিয়ে এলেন একদিন বিশাল এক বাক্স দরজা লাগানো দরজা খুললেই, চোখের সামনে খুলে যাবে, সাদাকালো পৃথিবী ছাদে তার মেরুদণ্ড পোঁতা, পোশাকি নাম অ্যান্টেনা তিনটে মাত্র চ্যানেল দূরদর্শন ওয়ান-টু-সেভেন মাঝেমধ্যে অ্যান্টেনায় বসে সভ্যতাকে অভিশাপ দিয়ে যেত কাক খড়কুটো ভেবে ছবি নিয়ে উড়ে যেত মহাশূন্যে আবার তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাণপন লড়াই এইরকম লড়াইয়ের দিনে আমরা কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধ দেখেছিলাম টিভিতে শুনেছিলাম, যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত / অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ / পরিত্রানায় সাধূনাং বিনাশায় দুষ্কৃতাম্ / ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।

অতিমানবেরা সত্যিই বারবার ফিরে আসবেন প্রয়োজনে এমনটাই বিশ্বাস করেছিলাম সে-সময় আফিমে ডুবে যাওয়া চিনে ভেসে উঠেছিলেন মাও জেদং ব্রিটিশরাজে চাপা পড়া ভারতের ধ্ধংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র ইতিহাস না পড়েও আমরা ততদিনে জেনে ফেলেছি টিভির কল্যাণে জেনেছি ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা জোরে বল খেলতে পারে না সুইংয়ের সামনে হোঁচট খায় বিদেশ সফরে কেবলই হার বাঁচানোর জন্য খেলে এরকম কত কী!

সমস্ত বিষয়েই এরকম আবছা বোধ নিয়ে ক্রিকেট দেখা শুরু সে-বয়সে রূপকথা পড়া, কমিক্স পড়া, খেলা দেখা একসঙ্গে শুরু হয়েছিল ফলত, আমি বিশ্বাস করেছিলাম ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমিতে বিশ্বাস করেছিলাম যে কোনোদিন অরণ্যদেবের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে সেই জন্যই হয়ত এক ভারতীয় ব্যাটসম্যান দুনিয়ার তাবড় পেসবোলারদের ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছেন মাঠের বাইরে এমন দৃশ্য আমাকে অবাক করেনি অথচ, বাড়ির ক্রিকেটবোদ্ধা বাবা-জেঠুদের অবাক করে, অতিমানবপ্রথা বজায় রেখে, ক্রিকেটে বিপ্লব আর রূপকথা মিলেমিশে যাচ্ছে তখন পেস বোলিং-এর সামনে বারেবারে ক্ষয়ে যাওয়া ভারতে, ইতিহাস ফুঁড়ে উঠে আসছেন আমাদের লিটল মাস্টার শচীন রমেশ তেন্দুলকর যিনি ব্যাট করতে নামলে গোটা দেশের ধুপপুক রিখটার স্কেলে মাপতে যিনি ছয় মারলে আমাদের ক্লাবের সেই দশফুট বাই দশফুট শতরঞ্চি জাদু-গালিচা হয়ে উড়তে চাইত আমরা গুলতি হাতে সজাগ থাকতাম অ্যান্টেনা লক্ষ্য করে উড়ে আসা কাকেদের জন্য মনে মনে একটা পার্টনারশিপ করে নিতাম শচীনের সঙ্গে আক্রম বা ম্যাগ্রার ঝড়ঝাপটা উনি সামলে দেবেন বদলে তীব্র ঝড়ের সময়ও অ্যান্টেনা সামলাব আমরা ছবি কাঁপতে দেবো না শচীনের নট-আউট কামনায় ঠাকুরঘরে শাঁখ বাজত হিন্দু পাড়ায় মুসলমান পাড়ায় নামাজ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের মধ্যেও যে রয়েছে একতাবোধ; শচীন তেন্দুলকর আউট না হলে, তা হয়ত আমরা জানতেই পারতাম না কোনোদিন

কিন্তু কোনো বিপ্লবই তো একা একা হয়নি ইতিহাসে কৃষ্ণের পাশে অর্জুন থেকেছেন মারাদোনার পাশে বুরুচাগা কিন্তু শচীনের কেউ নেই! টিমের অর্ধেক ব্যাটিং শচীন শচীন বিপক্ষকে পোড়াবেন আর বাকিরা হাত-পা সেঁকবে আঁচে যেদিন আগুন জ্বলবে না সেদিন রান্নাও চড়বে না বাকি লাইন-আপ দুর্ভিক্ষ শচীন আউট হলে চ্যানেল বদল কিংবা টিভি বন্ধ মাঠ থেকে বেরিয়ে যাবে দর্শক বাকি ম্যাচ হবে নির্জনতার ভিতর

আমাদের পুরনো বাড়ির একতলার রক থেকে গোটা পাড়াটাই দেখা যেত অবাক হয়ে দেখতাম শচীন প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলে মানুষ কেমন ফিরে যেত তার নিজস্ব চরিত্রে বামপন্থী আর ডানপন্থীরা আবার আলাদা হয়ে যেতেন পাওনাদার চেপে ধরতেন দেনাদারের কলার দোকানদার বন্ধ দোকানে ঝাঁপ তুলে বিক্রিবাটায় মন দিত ছাত্ররা ফিরে যেত হোমওয়ার্কের কাছে গৃহবধুরা রেডিওকে ক্রিকেট থেকে রবীন্দ্রনাথের দিকে ঘুরিয়ে, সেলাই মেশিনকে আপন করে নিতেন আবার ব্রাহ্মণ ফিরে পেতেন তার ব্রাহ্মণত্ব এতক্ষণ যাদের গায়ে গা লাগিয়ে খেলা দেখছিলেন তাদেরই জাত-পাত তুলে খেউড় করে হাঁটা মারতেন বাড়ির দিকে রকে দাঁড়িয়ে দেখতাম, কীভাবে মানুষ আলাদা হয়ে, ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়

যে মানুষ এমন অলিখিত বন্ধুত্বের চুক্তি করিয়েছিলেন দেশবাসীর, অদ্ভূতভাবেই ভারতীয় ব্যাটিংয়ে তিনি ছিলেন বন্ধুহীন ইংল্যণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যাট করতে নামা ষোলো বছরের কিশোর যখন নামছেন তখন ভারতের স্কোর এক উনিশ রানে চার উইকেট ব্যাট করতে নামতে না নামতেই ভারত এক সাতাশে পাঁচ দীর্ঘদেহী তিন ব্রিটিশ পেসার উইকেট সংখ্যায় ভাগ করে নিচ্ছে তাদের পূর্বপুরুষের উপিনিবেশকে এমন আক্রমণ যে চারজন ফিল্ডার স্লিপে, একজন গালিতে, পয়েন্টে একজন অর্থাৎ, প্রায় সব বলই পিছনে যাচ্ছে অথচ সাড়েপাঁচফুট এক বালক পাঁচ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে শুরু করলেন পালটা মার সোজা ব্যাট অলৌকিকভাবে সোজা সপাটে মারছেন, কখনও শুধু ছোঁয়া মাঠের সবদিকে বল যাওয়ার সেই জায়গাগুলোকে কয়েকটা দাগ কেটে যদি দেখানো যেত কোনখান দিয়ে গিয়েছে, তাহলে গোল মাঠটাকে মনে বিশাল এক সাইকেলচাকা একেকটা দাগ একেকটা স্পোক

খানিক্ষণের মধ্যে ফিল্ডার ছড়িয়ে গেল চারপাশে নিজের থেকে দেড়হাত লম্বা বোলারদের ততক্ষণে একহাত নিতে শুরু করেছেন লিটল মাস্টার প্রত্যেকটা ড্রাইভ যেন একেকটা বাক্য অফড্রাইভ মেরে বলছেন : আমাদের দেশ উপনিবেশ হতে পারে, কিন্তু এই দেশ অভিমন্যুরও কভার ড্রাইভ মেরে বলছেন : এই দেশ ক্ষুদিরামের অনড্রাইভ মেরে বলছেন : আমরা জাতিশ্মর, বালকবীরের দেশ ব্রিটিশ চক্রব্যুহ ভেদ করে এক উনিশ রানে অপরাজিত ছিলেন শচীন ঠিক যত রানের মাথায় ব্যাট করতে এসেছিলেন একাই করে যান সেই রান কিন্তু জেতাতে পারেননি কারণ সেদিন তার পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউই যে ছিলেন না!

ঠিক সময়ে ওদের পাশে পেয়েছি বলেই আমাকে এখনও এরকম দেখছো”, বলছিল নন্তু আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম এগরোলের দোকানে নন্তু বলছিল বাকি তিনজনের কথা রণে-বনে, জলে-জঙ্গলে, প্রেমে-অপ্রেমে কেমন কেটেছে ওদের দিন এর আগে প্রদীপ একদিন অভিনয় করে দেখিয়েছে, প্রথমবার বিয়ার খাওয়ার পর কেমন খাট আর খাটের তলার পার্থক্য গুলিয়ে ফেলেছিল দেবা বুবাইয়ের সংযোজন, “প্রথমবার খাওয়ার পর ট্যাক্সির দরজা খুঁজে পাচ্ছিল না নন্তুপাশ থেকে দেবা বলে ওঠে, “ট্যাক্সির চারপাশে সাতপাকে ঘুরছিলসমবয়সীরা এক হলে এরকম ঘটনা যে ঘটবে তা স্বাভাবিক আমি আশ্চর্য হইনি আশ্চর্য হলাম এই রোলের দোকানে দাঁড়িয়ে নন্তুর কথা শুনে ওর যখন মাধ্যমিক বয়স, হঠাৎ, মাঝরাতে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় বাবার তারপর ডাক্তার-হাসপাতাল-স্ট্রোক বাড়িতে মা, হাসপাতালে বাবা, মনে দুশ্চিন্তা, মগজে সিলেবাস বাড়ির কাজ সামলানো, হাসপাতালে রাত জাগা, স্কুলের পড়া, পরিবারকে সান্তনা দেওয়া নিজেকে চারভাগে ভাগ করে নিলেই একমাত্র সম্ভব বদলে নিজেকে চারগুণ করে নিয়েছিল নন্তু কারণ বন্ধুরা ভাগ করে নিয়েছিল দায়িত্ব ওদেরও তখন মাধ্যমিক তবুও কখনও দেবা রাত জেগেছে, কখনও প্রদীপ পৌঁছে গিয়েছে হাসপাতালে যত রাত হোক, যত অসুবিধে থাক ওরা কখনওনাবলেনি আমিও তো কতবার বাড়ি ফেরার সময় দেখেছি ওদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া চলছে, প্রায় হাতাহাতি হওয়ার অবস্থা আবার পরদিন বেরোনোর সময় দেখি একই দেশলাই থেকে আগুন ভাগ করে নিচ্ছে চারজনে ভাবছিলামআত্মীয় তবে দুরকম জন্মসূত্রে পাওয়া আর যাপনসূত্রে পাওয়া দ্বিতীয় ধরণকে আমরা বন্ধু বলে থাকি

নন্তু বারবার জিজ্ঞেস করে, “বলতে পারো ওদের ঋণ কীভাবে শোধ করব আমি?” সেদিন ওর কাঁধে অন্তরিকতার হাত রাখা ছাড়া আমার আর সত্যিই বলার থাকেনি কিছু! নন্তু বলে চলে কীভাবে প্রৌঢ় বাবা, দেখেছিলেন তার সন্তানসংখ্যা এক থেকে চারে পৌঁছে গিয়েছে, অসুখের দিনে বাবার শ্বাসকষ্টের পাশে দাঁড়িয়ে চারজনে বুঝতে পারে, সুসময় মানুষকে পরিচতি দেয়, দুঃসময় দেয় বন্ধু মাত্র ষোলো বছর বয়সেই জীবন তার একান্ত ক্লাসরুমে ডেকে এনে বুঝিয়ে দেয় ওদের

তারপর অনেক রাতে আচমকা ঘুম ভেঙে নন্তু দেখেছে, মা ঘুমোচ্ছেন মায়ের বন্ধ চোখের পাশ দিয়ে বালিশের দিকে নেমে যাচ্ছে জল এই জলের রেখার উৎসর্গ যে বাবার প্রতি, বুঝতে সময় লাগে না অথচ সেদিন ওর আর কান্না পায়নি! বলতে বলতে চোখ ডলে নন্তু তারপর এগরোলের দোকানের সামনে থেকে সরে যায় হাত দিয়ে ধোঁয়া সরায় সেদিন কাঁদেনি, আজ লঙ্কা-পেঁয়াজের ধোঁয়ায় চোখ থেকে বেরিয়ে আসছে জল মানুষ তো এভাবেই বড়ো হয় অভিনয় শিখতে শিখতে কে যেন বলেছিলমাথার ওপর থেকে ছাদ সরে গেলে তাড়াতাড়ি লম্বা হয় গাছপালা

মনে পড়ে, ছিয়ানব্বইয়ের লর্ডস শচীনের জাতীয় দলে সাত বছর খেলা হয়ে গেছে বিশ্ব ক্রিকেটে মহামানবদের তালিকায় ঢুকে পড়তে শুরু করেছেন বিপক্ষ জেনে গিয়েছে শচীনের উইকেট নিতে হবে শুধু ইংল্যণ্ডের হয়ে সেই কাজ করেও দিলেন লুইস এখন শুধু অপেক্ষা বাকিরা কতক্ষণে আত্মসমর্পণ করেন করতেও শুরু করেছিলেন বাকিরা শুধু দুজন বাদে সেদিন তাদের জীবনের প্রথম টেস্ট আজও তাদের সামনে অতিকায় পেস বোলার শচীন ফিরে গিয়েছেন তার কিছুক্ষণ আগে স্কোরবোর্ড দেখিয়েছে ব্যাট করছেন এক বাঁহাতি, আজই প্রথম চার বছর আগে একবার সুযোগ পেয়েছিলেন ওয়ান-ডে টিমে কিছু করতে পারেননি সেরকম নাম দেখাল, এস সি গাঙ্গুলি টিভিঘরের সামনে একটা চাপা গুনগুনবাঙালি রে, বাঙালি সেই বাঙালি নেমেই একের পর বল অফসাইডে ঠেলতে লাগলেন মনে আছে, সকালে বাবা অফিস যাওয়ার আগে প্রতিদিনই মা মাখন-পাঁউরুটি বানিয়ে দিতেন একটা ছুরি মাখনের ওপর চালাতেন মসৃ্ণভাবে কসরতহীন সাবলীল আর ছুরির গায়ে উঠে আসত মাখন সেই মাখন বুলিয়ে দিতেন রুটির গায়ে ছুরি দিয়েও যেন আদর করা যায় ছুরির মতো ব্যাটও তো একটা অস্ত্র ক্রিকেটযুদ্ধের একমাত্র তলোয়ার এই বাঁহাতিও অফসাইডে ঠিক ওইরকম ভঙ্গিতে ব্যাট চালাচ্ছেন কষ্ট নেই, পরিশ্রম নেই আর বলটা বারবার ফিল্ডারের মাঝখান দিয়ে সীমারেখা পার করে যাচ্ছে

পুরনো ব্যাটসম্যানেরা কেউই দাঁড়াতে পারছেন না শচীনও ফিরে গেলেন পাঁচ উইকেট পড়ে গেছে ভারতের আবার একটা টেস্ট হারতে হবে? এমনই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে তখনই ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নামলেন রোগা মধ্যবিত্ত চেহারার এক যুবক তারও আজ প্রথম টেস্ট রাহুল শরদ দ্রাবিড় দেখলে মনে হবে বেশিক্ষণ টিকবেন না নেমেও কিছুই করছিলেন না বাইরের বল সবই ছাড়ছিলেন নির্লিপ্ত মুখ-চোখ কিন্তু যখনই বল ব্যাটে ঠেকাচ্ছেন, দেখা যাচ্ছে, ওইরকম রক্ষণ আগে দেখিনি আমরা ব্যাট যেন শুষে নিচ্ছে বলের গতিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে ছুটে আসা বল ব্যাটে লেগে শান্ত হয়ে পড়ে যাচ্ছে তার পায়ের কাছে এই বল যেন তার পোষা বিড়াল দৌড়ে কাছে আসছে, গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ছে জুতোর পাশে

ভারতীয় ব্যাটিং পরিবারে জন্ম নিলেন সৌরভ-রাহুল বাঁহাতি ডানহাতি পার্টনারশিপ চুরানব্বই রানের পার্টনারশিপ করে গেলেন দুজনে জীবনের প্রথম টেস্টে সৌরভ লিখে গেলেন এক একত্রিশ রানের কবিতা রাহুল করে গেলেন পঁচানব্বই রান বুঝিয়ে দিলেন শচীন আর একা নেই সমস্ত ঋণ শোধ হবে এবার পার্টনারশিপ দিয়ে, বন্ধুতা দিয়ে

নিরন্তর একে অপরের সঙ্গ দিয়ে চলা ধীরে ধীরে প্রথা হয়ে গেল ভারতীয় ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কলকাতা টেস্টে প্রথম ইনিংসে ফলো-অন খাওয়ার পর নিজেদের ছাই থেকে উঠে দাঁড়ালেন সেই রাহুল দ্রাবিড় সঙ্গে লক্ষণ দুদিন টানা ব্যাট করে লক্ষণ করেন দুশোএকাশি রান পার্টনার রাহুল করেন একশো আশি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে চার সাতান্ন রানের জবাবে মাত্র এক একাত্তর রানে ফুরিয়ে যায় ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে লক্ষণ রাহুল ভারতের হয়ে একটি মহাকাব্য লেখার দায়িত্ব নিলেন

ঘুম থেকে উঠে দেখি খেলা শুরু হয়ে গেছে ব্যাট করছেন রাহুল দ্রাবিড় সাদা পোশাকে, তাকে বরফ ঢাকা হিমালয় পর্বতের মতন মনে হচ্ছে যে হিমালয় ভারতবর্ষকে বাঁচিয়ে রেখেছে উত্তরের শীতল হাওয়ার কোপ থেকে দ্রাবিড়ও ধূর্ত এবং শীতল মস্তিষ্কের অস্ট্রেলিয় বোলিংকে ঠেকিয়ে রেখেছেন অন্যদিকে লক্ষণ বিপক্ষের শীতলতার মধ্যে একটু একটু করে ভরে দিচ্ছেন উপমহাদেশের গরমকাল ক্লান্ত করছেন বিপক্ষকে প্রতিপক্ষ যখন সম্পূর্ণ ক্লান্ত তখন ইনিংস ডিক্লেয়ার দেন সৌরভ বাকিটা অবিশ্বাস্য ফলো-অন খেয়ে ধুঁকতে থাকা দল প্রথমবারের জন্য টেস্ট জেতে ইতিহাসে

কখনও শচীন-সৌরভ, কখনও সৌরভ-রাহুল, কখনও রাহুল-শচীন প্রতিবাদ নয়, প্রতিরোধের পথ তৈরি করতে শুরু করেন বোলিং-এও তখন কখনও কুম্বলে-হরভজন, কখনও জাহির-নেহেরা এক থেকে একতার দিকে চলে যায় ভারতীয় ক্রিকেট

এখনও একা একা বাড়ি ফেরার সময় বন্ধুদের কথা মনে পড়লে, এইসকল পার্টনারশিপ মনে পড়ে যায় একদিন বাড়ি ফেরার পথে দেখি কোচিংঘরে ঝুলছে ব্ল্যাকবোর্ড চক দিয়ে লেখাপদার্থবিদ্যা : তেজস্ক্রিয়তা স্যারের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছেতেজস্ক্রিয়তা পদার্থের ভিতরের শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় আশেপাশের পদার্থকেও তীব্রভাবে প্রভাবিত করে আকর্ষণ ক্ষমতা বেড়ে যায় এই অবধি শুনেই, মাথায় যেন বাল্ব জ্বলে উঠল মনে হল এক্ষুণি নন্তুর সঙ্গে দেখা করতে হবে ওকে বলতে হবে, বিজ্ঞানের ভাষায় বন্ধুত্বকে তেজস্ক্রিয়তা বলে

দেখা হওয়ামাত্র মুখ ফস্কে বলে ফেললাম অন্য কথা কী খেয়াল হল কে জানে! বলে বসলাম, “তুই ওপেন না করে ফার্স্ট ডাউন নামিস কেন? এতে তোর নিজের ওপর চাপ বাড়ছে আগে নেমে শান্তি করে খেলে আয়নন্তু কিছুতেই রাজি হল না পাশ থেকে বুবাই বলল, “ছেড়ে দাও বুঝবে না ডাঁশা মাথাএরকম একটা উত্তর কেউই আশা করিনি হাসি চাপতে চাপতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সময় মনে হলনন্তু ক্রিকেটকেও পরিবারের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করে হয়ত পরিবারের হয়ে বাবার পরে - তো ফার্স্ট ডাউন ব্যাট করতে নেমেছে অসময়ে যদি ওপেনার আউট হয়ে যায় তাহলে ওকেই নামতে হবে সামাল দিতে নিজেকে হয়ত এমনই এক দায়িত্ববোধ দিয়ে মুড়ে রাখতে চায় সে ক্রিকেট তো তার কাছে আতসকাচ যা সে সারাজীবন ধরেও রাখবে জীবনবইয়ের সূক্ষ্মতর সমস্ত অক্ষরের উপর হয়তবা, জীবনের ইনিংসে নন্তু, একজন সফল ফার্স্ট-ডাউন ব্যাটসম্যান হয়েই থেকে যাবে আমাদের বিধানপল্লীতে

No comments:

Post a Comment