অঙ্কের
দিদিমণি
(৫)
সুস্মিতা
ভাবেনি কোচিং ক্লাস ভরে উঠবে। সবাই খোঁজে অভিজ্ঞ স্কুলশিক্ষক। মনে হ’য়ে ছিল হাতে গোনা কয়েকজন আসতেও পারে। পড়াতে-পড়াতে সে পাকাপোক্ত
হবে। একটা বছর ভাল রেজাল্ট হ’লে কাজটা জমবে। যদিও জমা নিয়ে তার উদ্বেগ ছিল না। রোজগারটা
জরুরি নয়, ব্যস্ততা প্রয়োজন। এভাবে অন্য একটা আইডেন্টিটিও হোক। কিন্তু সুস্মিতা
অবাক হ’য়ে দেখল কী দ্রুত তার পড়ানোর ইচ্ছে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়ের বাবা-কাকা-দাদা-পিসে-মেসোদের ভিড়। আশ্চর্য
প্রদীপের ডাকে দুটো ব্যাচ ভর্তি হ’য়ে গেল। সপ্তাহে তিনদিন। সন্ধেবেলা দু-ঘন্টা। আনকোরা অবস্থায় এই অভাবিত ঘটনার কারণ সে বুঝতে
পারল অভিভাবকদের দেখে। এ সবই তার কম বয়সের ক্যারিশমার ফসল। সবাই চেয়েছিল
সুস্মিতাকে ভুলে যেতে। পারেনি। নিজেদের সময়কে মনে রাখতে গিয়ে দেখা গেল সুস্মিতাকে
মনে রাখতেই হ’চ্ছে। প্রকাশ্যে কে আর
ব্যার্থতা খুঁড়ে তোলে। ততদিনে সেইসব পুরুষদের জীবন মাঝনদীতে স্থির নৌকার মতো হ’য়ে
গেছে। কিন্তু ঐ যে বলে ‘নিম্নে সংলগ্ন অস্থির স্রোত বয়’- সুস্মিতা তাদের হৃদয়ে
বিঁধে ছিল অধরা আলেয়ার মত, থেকে গেল কঠিন পাথরের নিচে লাভা হ’য়ে । স্মৃতিবিদ্ধ অভিভাবকদের গ’লে পরা ভাব দেখে সুস্মিতা বুঝতে পারে এদের
কেউ কেউ সুরঞ্জন পরবর্তী পর্বের পত্রপ্রেরক। অনেকে সাইকেলে অনুসরণ করতো। চায়ের দোকানের
অস্থির পায়চারি, দক্ষিণের জানালার বাইরের দর্শনার্থীদের দেখতে পায় সে। অনেকে
পশ্চিমের ট্রেন যাওয়া দেখেছে সুস্মিতার সঙ্গে সুস্মিতার অগোচরে। এবং, প্রত্যেকের
কোনো না কোনো রাতের সঙ্গিনী ছিল সে। স্বপ্নে, দুঃস্বপ্নে। ছাত্রপ্রাপ্তি পরোক্ষে
তার গতরসুষমার ডিভিডেন্ট। সেইসব পুরুষরা
শেষপর্যন্ত সুস্মিতার কাছে আসতে পারল। এভাবে এসে কী হয়? কার যে কিসে এবং কীভাবে
হয়! সুস্মিতার অভিভাবকদের বলে, মাসে একবার প্রগ্রেসের খোঁজ নেবেন।
পড়ানো শুরুর
প্রথম রাতে ঘরের প্রমাণ সাইজের আয়নায় অনেকক্ষণ নিজেকে। শুধু সায়া পরে। অন্যকে
দেখার মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। পুরুষদের মতো কিছুটা উত্তেজিত হয়, একটু লজ্জাও পায়। আর
বুঝতে পারে তার ম্যাজিক এখনও অটুট। যে কোনো হৃদয়ে প্রতিবিম্ব তৈরিতে তার শরীর আরও
পারদর্শী হ’য়ে ছে। এদেশে পুরুষরা চর্বির অল্প
পরত্ পছন্দ করে। তবে, এই অমোঘ টানের কারণ শুধু শরীর নয়, না-পাওয়ার অতৃপ্তি, যে
অতৃপ্তি ঘুরপথে তাকে দিয়েছে টোল ভরা ছাত্র। বড় চাহিদা তাদের আর নেই। নিজেদের
জীবনের একটা চ্যাপ্টার একটু অন্যভাবে রিভাইস করা, এই যা।
আলো নিভিয়ে
নাইট ল্যাম্প জ্বালে সুস্মিতা। ভেতরে কিছু পরেনা, শাড়ি জড়ায় হালকাভাবে। তারপর
পশ্চিমের জানালা দুটো খুলে দেয়। সাড়ে দশটার পর এই সময়টা সুস্মিতাকে কী যেন ভর করে।
আধঘণ্টা ঠায় সে দাঁড়িয়ে থাকবে জানালায় ভর দিয়ে। দেখবে ট্রেনের দূরে চলে যাওয়া। কোনও
পুরুষের সঙ্গে তার কখনও প্রেম হয়নি। দশটা পঞ্চাশের মেল ট্রেনের সঙ্গে কীভাবে যেন
জড়িয়ে পড়েছে। অন্যগুলো ভালো লাগে, তবে এর কথাই আলাদা। হয়ত আলাদা নয়, মন আর শরীর
মেনে নিয়েছে তাই ভিন্ন। দূর থেকে বাঁশি শোনে সুস্মিতা। সে বুক চেপে ধরে জানালার
শিকে। পাতলা শাড়ির নিচে কিছু নেই। প্রথম ও তৃতীয় শিক বৃন্ত ভেদ ক’রে তার দুই স্তনে
দাগ ক’রে দেয়। দুটি সমান্তরাল লাল গাঢ়
রেখা। অল্প ব্যাথা লাগে। সুস্মিতার ভাল লাগে। ঐ দূরে, বাঁ দিকে রেললাইন বেঁকে গেছে।
পাকানো কেন্নোর মতো প্ররোচনাময় অর্ধচন্দ্রাকার বাঁক। ছোট খালের লোহার ছোট ব্রিজের
ওপর আওয়াজ শোনা যায়। সে এসে গেছে। সে খুব কাছে। আধো অন্ধকার থেকে হঠাৎ সে ছিটকে
বেরোবে। প্রথমে ভারী মুখ , তারপর গাছপালার অদৃশ্য সুড়ঙ্গ থেকে একটু একটু ক’রে
প্রস্ফুটিত হবে লাস্যময় শরীর। অনেকটা সময় নিয়ে যাবে সে। এ সময় গোটা বাড়ি জেগে ওঠে।
হরপ্রসাদ, প্রীতিলতা আরও না-দেখা পূর্বপুরুষরা, বিগত দিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণ।
কেউ তা জানে না। সুস্মিতা বোঝে। তখন হরর্ সিনেমার মতো এলোমেলো হাওয়া দেয়। দোতলায়
তার জানালার কাছে মখমলের কার্পেটে চড়ে কেউ আসে। তার মুখ দেখা যায় না। সুস্মিতা
বলে, ট্রেন যাক, তারপর এসো। আওয়াজ বাড়িয়ে ট্রেন আসে, শব্দ কমিয়ে সে চলে যায়। আবছা
আলোয় সুস্মিতা দেখে গার্ড সবুজ লন্ঠন দোলাচ্ছে। হয়তো তার জন্য। কখনও সে গার্ডকে
সুস্মিতা দেখেনি। রোজ এক গার্ড থাকে না। তবু লন্ঠন ধরা ঐ হাত যদি আজ রাতে তার
শরীরে হাত দিত সে অখুশি হ’তনা। এ দিন একটু বেশিই হ’ল সব। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে
গোটা শরীর জুড়ে ঝাঁকুনি। সম্পূর্ণ অচেনা অনিয়ন্ত্রিত আনন্দ। কাঁপতে থাকা সুস্মিতার
ঘাড় থেকে শাড়ি প’ড়ে গেল। আগে কখনও এরকম হয়নি। কে যে শরীর উল্টেপাল্টে দিল। যতক্ষণ
না ট্রেন প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে হারিয়ে গেল, তত সময় ধরে চললো এই আশ্চর্য কান্ড। সুস্মিতার
জীবনের প্রথম অর্গাজম। তাহ’লে এর জন্য পুরুষই
একমাত্র উপাদান নয়। ভেতরেবাইরে সম্পূর্ণ সিক্ত অবস্থায় মেঝেতে ব’সে রইল সুস্মিতা। অনেকক্ষণ,
চোখ বুজে। শরীরের গলা দিয়ে, বুক দিয়ে, নাভি দিয়ে, ঘাড় দিয়ে- গোটা শরীরের সব জল
নেমে যাচ্ছে। কিছু আর আয়ত্বে নেই, অথচ ভাল লাগছে। কখনও আত্মরতিতে এরকম হয়নি। এর
কাছাকাছিও না। অনেক দূরের সেকেন্ড পজিশনে রাখা যায় সুরঞ্জনের সেই অ্যাপ্লিকেশানের
দিনের কথা। কিন্তু, সে তো প্রতারণার পূর্বাভাষ। এক্ষেত্রে তৃপ্তি অনেক গভীর,
প্রেমিক ততোধিক বিমূর্ত।
ঘুমোনোর সময়
সুস্মিতার মনে হ’ল সে বোধহয় স্বাভাবিক নয়। তার শরীর নির্জীব চিঠি, ট্রেনের হুইসল,
গার্ডের লন্ঠনে সাড়া দেয়, কই সামনে থাকা পুরুষে তো কিছু হয় না। ছোটবেলায়, সেই যৌন
কৌতূহ’লের বয়সে যখন তুতো ভাইরা কিংবা তাদের
বন্ধুরা গায়ে হাত দিয়েছে কিছু হয়নি। কেউ অন্ধকারে বাড়াবাড়িও করেছে, কিছু তো হয়নি।
সে ভাবে, বাবার সঙ্গে লড়তে লড়তে সে-ও বাবার মতো খানিকটা বিদঘুটে হ’য়ে পড়েছে। যে
যার বিরোধিতা করে সে নিজেও কি প্রতিদ্বন্দ্বীর জটিলতার অংশ হ’য়ে পড়ে?
শুরুর সময়
সুস্মিতা বুঝতে পারে বাবা-কাকা-দাদাদের গভীর পিরীত ক্ষণস্থায়ী। রেজাল্ট ভাল না হ’লে
সব এক মরশুমে উবে যাবে। এবং, শুরু হবে চরিত্রহনন। ও মেয়ে আবার টিচার হবে? রূপ দিয়ে
কি অঙ্ক হয়? মাথা লাগে। সুস্মিতার মাথার অনেকটা পৈতৃকসূত্রে গলিঘুঁজিতে যাতায়াত ক’রলেও
অঙ্কের মাথা বরাবর ভাল। সে ঠিক করে ইলেভন-টুয়েলভ নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আপাতত
মাধ্যমিকে হাত পাকুক। তার জন্য নিজের মতো একটা সহজ ছক বানাল। ভাল আর মাঝারি
ছাত্রদের আলাদা আলাদা স্কিম। দুটো বছরকে সে ভ’রে ফেললো একটা হ্যান্ডি
ক্যাপসুলে-অবজেক্টিভ থাকবে ১৮ নম্বর। বেছে ৭০-৭৫টা করালেই মার নেই, ভালরা ১৭,
অর্ডিনারিরা ১৫ নিশ্চিত। দু-ক্লাসের জ্যামিতির পঁয়ত্রিশটা উপপাদ্যের পনের’টা করলে
১২ নম্বর ছাঁকা। দুটো কমন পাবেই। সম্পাদ্য মাত্র সাতটা, তার একটা আঁকতে হবে। হ’য়ে
গেল আরও ছয়। ভালরা ছাড়া এক্সট্রাগুলো পারবে না, তাই চার নম্বরের দুটো বাদ।
অ্যালজেব্রায় পাঁচরকমের উৎপাদক প্র্যাকটিস করাতে হবে, তিরিশটা অঙ্ক ঘুরিয়েফিরিয়ে।
তিনটের মধ্যে যেকোনো দুটো। তিন তিন ছয় সিওর। তুলনামূলক, পরিবর্ত, অপনয়ন আর
বজ্রগুণন শুনতে যত বিটকেল করা ততই সহজ। অসমীকরণ সবার মাথায় ঢোকে না, ওটা গ্রাফের সঙ্গে
অথবা থাকবে। গ্রাফ ভুল করা যায় না। তাহ’লে
আরও ৬। অনুপাত-সমানুপাত ভালদের কাছে জলভাত, মাঝারিরা পুরো নম্বর পাবে না। করণী
সবাই পারে। অ্যালজেব্রায় প্রশ্নের অঙ্কের ৪ নম্বর নিয়ে সংশয় থাকবে। সেটা ছাড়লেও ২১
নিরাপদ। পাটিগণিতে বড় অঙ্ক থাকবে। ৬+৬। শতকরা, সরল সুদ আর অংশিদারী কারবার ক’রলে
পেরে যাবে। ত্রিকোণমিতির হাইট অ্যান্ড ডিসট্যান্সের অঙ্ক শক্ত। ওটা ভালদের।
পরিমিতিও ওদের। একটু বুঝলে ৮ মার্কস। ছক
অনুযায়ী মাঝারিদের ৬৫-৭০ এবং ভাল ছাত্রদের ৮৫-৯০ সম্ভব। সুস্মিতার বিশ্বাস সাফল্য
একমাত্র অনুশীলনে আসে। তাও তার ছক মেনে। নিজের ধারণাকে রূপ দেওয়ার জন্য সুস্মিতা
সাত দফা নিয়মাবলী করলো। ১) ছাত্রদের বাড়ি না যাওয়া, বিশেষ নিমন্ত্রণেও না। ২)
অভিভাবকদের সঙ্গে রাস্তায় কথা না বলা। ৩) বেডরুমে সবাই ব্যানড্, প্রিয়
ছাত্রছাত্রীও না। ৪) মাসিক পরীক্ষায় ফেল করলে পড়ানো হবে না। ৫) উৎসবে আদিখ্যেতা
চলবে না। যেমন, দোলের বিকেলে আবির চলতে পারে, কিন্তু পায়ে, তার ওপরে নয়। ৬)
টিচার্স ডে-তে সবাইকে আসতে হবে খাওয়াবে সুস্মিতা। গিফট আনা যাবে না। ফুল বা সস্তার
পেন অ্যালাউড। ৭) প্রতিটা ছাত্র মাসে একদিন ক্লাস নেবে। দাঁড়িয়ে, ব্ল্যাকবোর্ডে।
সেদিন সুস্মিতাও স্টুডেন্ট।
এইসব
নির্ভুলভাবে করার জন্য সুস্মিতা একটা স্টাইলিশ ও গম্ভীর চশমা কিনল ও. কে. অপটিক্যালস্ থেকে। সেক্স অ্যাপিল
কমে এলো সম্ভ্রমের পরশ। প্রথম বছরে সুস্মিতা মায়েদের আস্থা পেয়ে গেল- না, মেয়েটা
ভাল, বেটাছেলেগুলোই মেনিমুখো। দ্বিতীয় বছর সুস্মিতার কাছে লম্বা লাইন। অ্যাডমিশন
টেস্ট দিতে হয় ভর্তির জন্য। তৃতীয় বছর একটা এডুকেশন ওয়ার্কশপে শিক্ষার পদ্ধতিগত
সমস্যা নিয়ে বক্তব্য রাখে দিদিমণি। চতুর্থ বছর রিজার্ভেশনের দীর্ঘ লাইনের পেছনে
ম্যাডামকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্টেশনমাস্টার বলে, ‘আমার ঘরে বসুন, আমি কেটে
দিচ্ছি।’ সুস্মিতা বলে, ‘তা কী ক’রে হয়, এত লোক সামনে, না হয় একটু দাঁড়ালাম’।
অভিভুত স্টেশনমাস্টার গলা তুলে, ‘ এই না হ’লে টিচার’ বলায় সবাই ঘুরে তাকায়। তখন
সুস্মিতার আইডেন্টিটি এস্টাবলিসড। পঞ্চম বছরে সুস্মিতার পিরিয়ড ইররেগুলার হ’য়ে
পড়ে। অব্যবহারে কি অকালে বন্ধ হয়, এরকম সন্দেহের মধ্যে আঠারো দিনের মাথায় হয়
ঢাকঢোল পিটিয়ে, কোমর-তলপেট ভেঙে পড়ে ব্যাথায়, খুলে যায় ঋতু। পাঁচ বছরের মধ্যে সেই
প্রথম ক্লাশ বাতিল করে সুস্মিতা। সে সন্ধ্যায় এক ছাত্রের মা আসে দেখা ক’রতে।
সাঁচিস্তুপের মতো চেহারা, কী ক’রে নড়াচড়া করে! সুস্মিতার ভাবনার মাঝে মহিলা শুরু
করেঃ কিছু যদি মনে না কর একটা কথা বলি।
- বলুন। মনে করলেই বা কী।
- এবার তুমি একটা বিয়ে করো।
- অনেকেই তো করে না।
- সে না করুক, তা ব’লে তুমি করবে না কেন? দেরী অনেকের একটু হয়
বটে...তবে, সময় যায়নি... ঐ যে কথায় আছে, যে নারীর পুরুষ নাই...
- অনেক মেয়ের থাকে না। কড়া চোখে তাকায় সুস্মিতা।
- ও কথা থাক, এই ফটোটা দেখো। হ্যান্ডব্যাগ থেকে পোস্টকার্ড
সাইজের ছবি বের করে পল্লবের মা।
সুস্মিতা দেখে পুরু গোঁফের এক যুবকের ছবি। স্টুডিয়োয় তোলা, পেছনে ঝুলছে
গুলমার্গের বরফ। -এ’তো বাচ্চা ছেলে। এই আমার পাত্র নাকি।
- হ্যাঁগো। ও মোটেও বাচ্চা নয়। আমার থেকে কত বড়, আমার বড়দা। এ
তো এইট্টি টু-র ছবি, যখন গ্র্যাজুয়েট হ’ল, এখন টাক প’ড়ে গেছে। খুব ভাল লোক।তোমার
চেয়েও বেশি টিউশনি করে, কলেজে পড়ায় তো। দোজবরে তোমার আপত্তি নেই তো। সুস্মিতা
হাসে। এইট্টি টু-তে হরপ্রসাদ মারা যান, তখন সুস্মিতার সাত। সে ভাবতে চেষ্টা করে
মানুষটাকে এখন কেমন দেখতে হ’য়েছে।এক টেকো প্রৌঢ় এক ঘরে পড়াচ্ছে, তার পাশের ঘরে আরও
এক ঘর ছাত্র পড়াচ্ছে সুস্মিতা এমন দৃশ্য মাথায় এলো। এবং, বরের ছাত্ররা গোপন
প্রেমের সাধু প্রস্তাব দিচ্ছে আর বাতিকগ্রস্ত বর তাতে পাগল হ’য়ে যাচ্ছে, এরকম
পরিণতিও দেখতে পেল।কথা হচ্ছিল খোলা বারান্দায়। ফলস্ ঝাড়ের বাতির নিচে। সে বলে,
‘ছেলেকে বলবেন পড়ায় মন দিতে, এবার চেপে খাতা দেখা হবে।
- আর আমার কথাটা।
- কোন কথা?
- ঐ যে দাদার ব্যাপারটা গো।
- ও হ্যাঁ, দাদাকে আমার প্রণাম জানাবেন। আমার হবে না।
সুস্মিতা
উচ্চমাধ্যমিক শুরু করে পঁয়ত্রিশ পেরিয়ে। মাধ্যমিকের ঠিক পাঁচ বছর পর। শুরুতেই
জানিয়ে দেয়, এখানে জয়েন্টের জন্য তৈরি করা হয় না। যারা পিওর সায়েন্স পড়তে চায়,
বিশেষত, যারা অনার্স ও মাস্টার্স বা পরে রিসার্চ ক’রতে
চায়, প্রেফারেন্স দেওয়া হবে তাদের। আর, ভর্তি হতে হবে ইলেভেনেই, টুয়েলভে নয়। এ
শর্তেও দুটো ব্যাচ ভ’রে গেল। ব্যাচে আটজন। নতুন শিক্ষার প্রথম মাসেই বিপর্যয়-
বাবার সেরিব্রাল অ্যাটাক। এই অসুখটা সাধারণত বাথরুমে অপেক্ষা করে। ছেলেরা তখন
পড়ছিল। কোণের ঘরের লাগোয়া বাথরুমে লোহার বালতির বিকট শব্দে সবাই চমকে ওঠে। দরজা
ভেঙে বের করা হয় দেবপ্রসাদকে। ভাগ্যিস ইলেভেনের ছেলেরা একটু ম্যাচিওর হয়। দিদিমণির
সঙ্গে তারা ছোটে নার্সিংহোমে। আর, এম, ও বলে, ক্রিটিকাল কেস, বড় হাসপাতালে যান,
এখানে ডেলিভারি হয়। তখন অক্সিজেন আর স্যালাইন লাগিয়ে নামী হাসপাতালে। ডাক্তার বলে,
বাহাত্তর ঘন্টা না কাটলে বলা যাবে না। কেন একাত্তর বা তিয়াত্তর নয়? কেউ জানেনা।
একেই বোধহয় আগেকার লোকে বলত, তেরাত্তির না পেরলে বিশ্বাস নেই। চাঁদু ডাক্তার
বিমর্ষ হ’য়ে গেল। সে
তখন বাতের ব্যাথায় কাবু। হাঁটু বেঁকে গেছে। সরাসরি এসেছিল গাড়ি নিয়ে। তার ধারণা,
শেষ বন্ধুটা বোধহয় গেল। কিন্তু দেবপ্রসাদ গেল না, ফিরে এল অংশত অসাড় ডানদিক আর জড়িয়ে
যাওয়া জিভ নিয়ে। মামারা এসেছিল দেখতে। ‘মা তুই একদম একা হ’য়ে পড়লি, এবার চল।’ শুনে
সুস্মিতা সেবা শুরু করল। কেউ ভাবেনি সুস্মিতা এত কিছু ক’রতে পারবে। ঘড়ি ধরে ওষুধ
খাওয়ানো, রুটিনমাফিক চেক-আপ, দিনে দু-বার প্রেসার মাপা, ট্রেনড্ নার্স রেখে
বাথরুমের কাজ বিছায়ানায় করানো এবং শরীরের পরিবর্তন অনুসারে ডায়েট ও মেডিসিন নিয়ে
ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান চাঁদুর পরামর্শ- দুমাস চলল এই শিডিউল। মাঝরাতেও উঠে উঠে দেখে
ঠিক আছে কি না। দেবপ্রসাদ চেয়ে চেয়ে দেখে আর তার ঠোঁট ফুলে ওঠে, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে
পড়ে। সুস্মিতা মুখ ঝামটা দেয়, ‘বেশি ইমোশনাল হ’য়োনা, সব বিগড়ে যাবে।’ কিছু বিগড়োল
না। ফেরার পনের দিনের মাথায় খুলে গেল কোচিং সেন্টার। দুমাসের মাথায় শুরু হ’ল
পুরোদস্তুর ফিজিওথেরাপি। ছমাসের গোড়ায় একটু একটু করে সাড় ফিরে আসল পায়ে। চাঁদু
ডাক্তার প্রায়ই আসত, ‘এই পুরনো সিঁড়ি আর দুম্বো বাড়ি আমায় শেষ ক’রে ফেলবে’ বলতে
বলতে উঠত, তারপর ইজিচেয়ারে নিভে আসা টিউবলাইটের মত ব’সে থাকতো। পকেট থেকে পাঁইট
বের করলে জল গ্লাস পাঠিয়ে দিত সুস্মিতা। হুইস্কি খেতে খেতে সে স্বগতোক্তি করতঃ
দেবুর কপাল ভাল। ভাগ্যিস থ্রম্বোসিস হ’য়েছিল, হেমারেজ হ’লেই
কেল্লা ফতে। মেয়ের পুণ্যিতে বেঁচে গেল শালা। টাল খাওয়া জিভে দেবু কষ্টেসৃষ্টে কথা
বলতে চাইত। ইজিচেয়ারের ফোল্ডিং হাতগুলোয় পা ছড়িয়ে ডাক্তার বলতো ‘এ বয়সে বলার কিছু
থাকে না, শোনারও না। বৃথা বাক্যব্যয়। তবু বেঁচে যে আছি এটা বেশ আনন্দের।’ মরার বয়স
দুজনের মোটেই হয়নি, কিন্তু একজন কিছু না ক’রে, অন্যজন যুক্তিগ্রাহ্য জগৎ ছেড়ে
আধ্যত্মিক যাত্রার পথের সংশয়ে বয়স বাড়িয়ে ফেলেছে। সার্ভিসিংযের অভাবে কলকব্জাগুলোয়
ছ্যাত্লা পড়ে গেছে। ইজিচেয়ারটা তখন ছিল রুগীর ঘরে। ওয়াকার কেনা হতে সেটা ফিরে গেল
পুরনো জায়গায়। সাড় ফিরতে ওয়াকার ধরে ধরে দেবপ্রসাদও ফিরে গেল ইজিচেয়ারে।সেই চেনা সেট-ইজিচেয়ার,
আব্দারমাফিক তেপায়া টেবিলে দাবার বোর্ড আর খবরের কাগজ। দিনের আয়া বন্ধ ক’রে রাতের
জনকে খালি বহাল রাখা হ’ল। সব যেন নিয়মে চলে। প্রেশার ক’মিয়ে রাখতে হবে। যে কোনো
উত্তেজনা বিপজ্জনক, সেকেন্ড অ্যাটাকে ফেরে না। খোলামেলা শান্তির পরিবেশ দরকার। -এই
ক্যাসেটটা যেদিনই আসে ডাক্তার বাজায়। সুস্মিতা বলে, ‘অশান্তি তো নেই। মন যদি
পাকানো হয়, উৎপাত যদি ভেতরে থাকে, উপায় কী!’ চাঁদু বলে ‘এতই বোঝো তো বদলে যাও না
কেন?’ পেশেন্ট দুজনের কথায় ঘাড় নাড়ে। বাবার চলাফেরা শুরু হতেই সুস্মিতা পুরনো
ফর্মে ফিরে গেল। সে আবার কথা বন্ধ ক’রে দিল। অদৃশ্য হ’ল সব ক্ষমা। হাসিখুশি ফ্লোরেন্স
নাইটিঙ্গেলের জায়গায় ফিরে এলো এক কঠোর ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা। দেখভালের দায়িত্ব রইল
কাজের লোকেদের ওপর। দেবপ্রসাদের অবশ্য কিছু বদল বরাবরের মতো হ’য়ে গেল। মস্তিস্কের
কোনো স্থায়ী পরিবর্তনে সে নরম শিশুর মতো হ’য়ে পড়ে। ভারসাম্য ছিলনা একদম। যে আসতো
তাকে বলতো, তাড়াতাড়ি একটা পাত্র দেখো না ভাই। আর, কাঁদতো ঠোঁট ফুলিয়ে। কারণ লাগতো
না তার জন্য। দুধে খই কম কেন, খইয়ে ধানের খোসা কেন, ছেলেরা এখনও পড়তে এলো না যে,
কেন বৃষ্টি অসময়ে। শব্দ নেই, ট্রেন কোথায়- যে কোনো ছুতোয় তার কান্না পেত। অস্পষ্ট,
ঝাপসা চোখে চেয়ে থাকতো দাবার দিকে। ঘুঁটি নড়তো না, তবু। সুস্মিতা সরকারি
হাসপাতালের নিস্পৃহ ডাক্তারের মতো সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের পুরোনো রুটিনটা ধ’রে
ফেললো।
পুরনো রুটিন ব’লতে ঘরে একা একা থাকা। ছাত্ররা চলে গেলে
দিনরাতের নানা সময়ে দক্ষিণের জানালা দিয়ে রাস্তা দেখা, তাদের দর্শন দেওয়া। পশ্চিমের
খোলা জানালা দিয়ে ট্রেন দেখা, প্রেমিকের অপেক্ষায় থাকা। দুপুরবেলায় ফাঁকা রাস্তা
দেখা। রোদ মেঘ পোষ্টম্যান দেখা। ভিখারি রেডিও পাখিদের শোনা। রোদের তাত, বৃষ্টির
ছাঁট, শীতের আমেজ নেওয়া। আর টুকটাক বই পড়া। কখনও গল্পের, কখনও অঙ্কের। ভোরবেলাটা
ইদানিং বদলে ফেলেছে সুস্মিতা। অন্ধকার ফুরনোর আগে সে উঠে পড়ে। ছাদে চলে যায়
প্লাস্টিকের মাদুর নিয়ে। শিশিরভেজা সুরকির ছাদে খালি পায়ে হাঁটে। শীতের সকালটা
ওয়াটার কালারে আঁকা, কুয়াশার সমুদ্রে একা হারিয়ে যাওয়া জাহাজের মতো, একটু বিষণ্ণ। কাজ
না হ’লেও বর্ষা পছন্দ করে সে। সাদা-কালো
ছাই-ছাই আকাশের মাঝে নীলের ছিটে। ধুলোধোঁয়া কম। গাছপালা ঝুপ্পুস তাজা। ভিজে সব
প্রাণী খুশি। ভিজে খুশি সুস্মিতা। বর্ষা শেষের পথে। দূরে ইট ভাটার চিমনিগুলোর মুখে
আটকে আছে আবছা ধোঁয়া, চিলেকোঠার সিঁড়িতে ব’সে
দেখে সুস্মিতা। তাপমাত্রার ভেদাভেদ, হাওয়ার বিভিন্ন স্তর সে দেখে কেকের মতো কেটে
কেটে। আগে এসময় কয়লার ইঞ্জিন যেত, উড়ে আসতো গুঁড়ো কয়লা। কিছু রোমান্স আর আফ্রিকান
লোকগায়কদের ভারী আওয়াজ নিয়ে তারা বিদায় নিয়েছে। তা একবছর হ’ল। এখন ঘরের জানালা ভোরে বন্ধ রাখতে হয় না। সুস্মিতা আলোর
ক্রমশ ফুটে ওঠা দেখে। তারপর উঠে সিঁড়ির আলো নেভায়। পোশাক বদলায় চিলেকোঠার ঘরে ঢুকে।
আগে উঁচু বাড়ি ছিল না আশেপাশে। জানালাদরজা খুলেই শাড়ি ছাড়ত। ব্লাউজের ওপর চুড়িদার।
কিছুদিন হ’ল একশো মিটার দূরে পুকুরের ঐ কোণে পাঁচতলা ফ্ল্যাট উঠেছে। নাম
দিয়েছে লেকভিউ।তারপর সুস্মিতার নির্জনতা কমে গেছে। মাসখানেক হ’ল সে বেশ অস্বস্তিতে আছে। ব্যায়াম করার
সময় সে দেখে চারতলার ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে একটা ছেলে ঠায় চেয়ে থাকে। চোখাচুখি হ’লে জানালা ভেজিয়ে দেয়। তারপরও সুস্মিতা
টের পায় ফাঁক দিয়ে ছেলেটা চেয়ে আছে। রোজ এক ঘটনা। অতদুর থেকে কি দেখে? বায়নাকুলার
আছে? অথবা নেই। সুস্মিতা কয়েকটা আইটেম বাদ দেয়। যেমন সর্বাঙ্গাসন। কে ও? খোঁজ নিতে
হবে, মাদুর গুটিয়ে নামার সময় ভাবে।
প্রায় বছর সাতেক
টিউশনি করার পর সময়ের ফারাকটা টের পায় সুস্মিতা। ইন্টারনেট, ফেসবুক, ই-মেল এবং
মোবাইলের কানাকানিতে ছেলেমেয়েরা অনেক চৌখস, বাইরের জগৎ জানে। ব্লু-ফিল্মের
অভিজ্ঞতায় নগ্ন নারীশরীরের ছোকছোকানি কম। তবু, বয়সের কিছু আবেদন বোধহয় মেলানোর নয়।
লাইভ মহিলা দেখার উৎসাহ এবং তাকে ঘিরে স্বপ্ন বোনার প্রবণতা একরকম রয়ে গেছে। কাঙ্খিত
মহিলাকে এখনো তারা আড়চোখে দেখে, এখনও উসখুস করে। নাইন-টেন শেপলেস, তবে রিপুর
আলেয়ার ডাক তারা শুনেছে। ইলেভেন-টুয়েলভ কম্পিউটার স্যাভি হ’লেও তাদের ব্যক্তিগত মিথুনমন্দিরে সুস্মিতা
আছে।দিদিমণি খাতায় ঝুঁকলে তারা উঁচু হয়, ক্লিভেজের শেষটুকু চায়।দিদিমণি বোর্ডে
গেলে তারা ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে দেখে কোমরের ওপরের খোলা অংশ ছাড়িয়ে স্তনের নিচের আভাস।
কেউ কেউ পাছামনস্ক হ’লেও আধুনিক প্রযুক্তি স্তন্যপায়ীদের
স্তনবিমুখ ক’রতে পারেনি। সব দুগ্ধপোষ্য। মেয়েদের কেউ কেউ পূর্ণ যৌনতার
স্বাদ পেয়েছে মনে হয়। সুস্মিতার কেমন নিজের ওপর করুণা হয়। সে-ও তো পারতো এমন
স্বাভাবিক হতে। মাংসল যৌনতা না পেয়েই কেটে গেল অনেকটা। কম বয়সের ইমেজ তার কাছে
কাউকে যেতে দেয়নি। বেশি বয়সের ইমেজ তাকে কারোর কাছে যেতে দেয় না। তবু, মাঝে মাঝে
সে বোঝে শরীর ইমেজের ধার ধারে না। সে তৈরি। বাঁশি বাজলেই হ’ল। শুধু কানে শুনলে হবে না। মন চায় চোখে
দেখতে, শরীর চায় স্পর্শ।
ইদানিং বিচিত্র সব
দিকে মন ছুটছে। সুস্মিতা নিজেই বুঝতে পারে তার মধ্যে অজান্তে এমন রূপান্তর ঘটেছে
যা সে আগে ভাবেনি। অন্যের গোপন কথা গোপনে জেনে নিতে ইচ্ছে হয়। ওপর থেকে ভাড়াটেদের
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। ঝগড়া শুনলে কান বাড়ায়। খাবার চালাচালি দেখে, কী থাকে মেনুতে।
দুপুরে মাঝের ঘরের বিবাহযোগ্যা মেয়ে কার সঙ্গে কথা বলে? কে বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে
ঠোঁট নেড়ে দেয়? এ ঘরের জামাইয়ের নজর ওঘরের বউয়ের দিকে। রাস্তার অচেনা লোকের
অপ্রস্তুত আচরণের অপ্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ করে। বাবার আয়াকে মোটরসাইকেলে ক’রে যে পৌঁছে দেয় সে তো অনেক ছোট। নিজেকে
দেখে সুস্মিতার বিস্ময় বেড়েই চলেছে। সে দেখে পোষ্টম্যান ছাড়াও কত ক্যুরিয়ারের ছেলে
চিঠি নিয়ে আসে। বেশ স্মার্ট হ’য়ে ছে ছেলেগুলো, সার্ভিসও ফাস্ট। গত কিছুদিন
ধ’রে মৌসুমিদের বেশ চিঠি আসছে। কাজের মেয়ে
জানিয়েছে মৌসুমির ‘লাভ আছে’, ছেলেটা ভাল নয় তাই চটপট চেষ্টা চলছে। কাগজে খবর
বেরিয়েছে। সুস্মিতা শোধরায়, ‘খবর নয় বিজ্ঞাপন’।
পরের কটা দিন
সুস্মিতা খুব পাত্রপাত্রী সংবাদ পড়ল। পুরনো কাগজও। কত ধরণের মানুষের কত চাহিদা। বার
বছর আগে হ’লে নিরানব্বই শতাংশ চাহিদা সে মেটাতে পারতো। এখন বড়জোর দশ
শতাংশ, বয়সে মার খাচ্ছে। তবু পড়তে পড়তে নেশা ধরে গেল। প্রথমে পড়ল রঙ দেওয়া বক্সগুলো।
তারপর যেগুলোয় ছবি আছে। ছবিতে নিজেকে বসিয়ে দেখল বয়সটা না বললে ফরেনে প্রবাসীদের
জন্য পারফেক্ট ম্যাচ। বয়স থাকলে কি সে ক’রতো,
নাকি এখনও সে ক’রবে? সুস্মিতা
জানে এ খেলার মানে নেই, রাজি সে হ’তনা।
কক্ষনো না।
লোহার গেট খোলার
শব্দে বিছানা থেকে মুখ বাড়ায় সুস্মিতা দেখে পোষ্টম্যান। আজ চিঠি এসেছে, অনেকদিন পর
তার একতাড়া চিঠি। লেটারবক্সের গর্ত দিয়ে একবারে ঢুকল না। ছোট ছোট গোছা ক’রে ঢুকিয়ে লোকটা চলে যেতে সুস্মিতা নিচে
নামে। ধীরেসুস্থে চারপাশ দেখে। গেটের ভেতর ঘরোয়া বাগান হওয়ার পক্ষে অনেকটা জমি। লাইন
দিয়ে ডুরান্ডা আর দুটো ঝাউগাছ লাগিয়েছে মৌসুমির মা। অন্য ভাড়াটেরা সামনেটা ঢেকে
ফেলেছে টগর, গন্ধরাজ, জবায়। এলোমেলোভাবে। হাওয়াই চটি প’রে বাগানে পায়চারি করে সুস্মিতা, পুকুরপাড় অব্দি যায়। আড়চোখে
ঘরগুলোয় উঁকি মারে। আড়চোখে দেখে লেটারবক্স। অনেকদিন একসঙ্গে এত চিঠি আসেনি। কারা
পাঠালো? উত্তেজনা হয় ভেবে। কিছুক্ষণ পরে চাবি ঘুরিয়ে চিঠিগুলো বের করে সে। সিঁড়িতে
ওঠার সময় ঘাড় ঘোরাতে সে দেখে রাস্তার ওপারে গোলাপী স্কুটির ওপর থেকে ড্যাবড্যাব ক’রে একটা ছেলে তাকিয়ে চোখাচোখি হ’তে চমকে গাড়িতে স্টার্ট দেয় সে। কে এটা,
এসব তো আঠারো-কুড়ি বছর আগে হত, আবার শুরু হচ্ছে নাকি, ভাবতে ভাবতে ওঠার সময়
সুস্মিতার মনে হয়, হয়তো ভোরবেলার সেই ছেলেটা। ব্যাটা বড্ড ছোট। অতদূর থেকে ঠাওর
হয়না, তবু মনে হচ্ছে ও-ই। খোঁজ নিতে হবে।
ঘরে গিয়ে মুষড়ে
পড়ল সুস্মিতা। একটা চিঠিও তার নয়। সব কালীপদবাবুর। তার মানে মৌসুমির বিজ্ঞাপনের
উত্তর। ধ্যুস্। মন খারাপ হ’য়ে যায়। ড্রেসিংটেবিলে তাড়াটারেখে বিছানায় কাৎ হ’য়ে শোয়। কাগজ খুলে আরও পাত্রপাত্রী সংবাদ পড়ে। দেশে কত মানুষ বিয়ের জন্য মরীয়া হ’য়ে উঠছে বাপরে! বারবার চোখ গেল চিঠিগুলোর দিকে। বিকেলেই
দিয়ে আসতে হবে। কী লেখা থাকে চিঠিতে? অন্যের চিঠি দেখা অন্যায়। দুপুর গড়িয়ে
বিকেলের কাছে যেতে মনে হ’ল তার বাক্সে এসেছে তারই পড়ার জন্য, এতে
অনৈতিক কিছু নেই। দেখলেই হয়। একসময় না পেরে খুলে ফেললো। একে একে সতেরোটা। সবার
ভার্সান মোটামুটি এক- দাবিদাওয়া নেই। স্বচ্ছল পরিবার। বাবা রিটায়ার্ড। ননদের বিয়ে হ’য়ে গেছে। স্বক্ষেত্রে ভাইরা প্রতিষ্ঠিত। কেউ অন্য
রাজ্যবাসী, কেউ কাছের। প্রকৃত সুন্দরী ও ইংরেজিতে দক্ষ মেয়ে জেনে তারা ইমপ্রেসড। সংস্কার
ও রুচিতে এই পরিবারের সঙ্গে মিলবে বেশ। এগারোজন সঙ্গে ছবি পাঠিয়েছে। প্রাথমিক
কথাবার্তার পর অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে মেয়ের সঙ্গে বাইরে আলাদা দেখা ক’রতে চায়
উদারপন্থীরা। সুস্মিতা দেখল, ননদের বিয়ে হ’য়ে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। মৌসুমি ফটোজেনিক,
তবে সুন্দরী নয়, তাই সামনাসামনি হ’লে কেঁচে যাবে। পড়তে পড়তে কৌতূহ’ল উবে
গেল। মনে হ’ল, ইস্ মৌসুমির ক্ষতি করে ফেললাম। তারপর সে ভেবে ঠিক করে
চিঠিগুলো আবার সে পোষ্ট করবে। নতুন খামে ভ’রে
ভিন্ন ভিন্ন শহর থেকে, একটু সময়ের গ্যাপে। দু-তিনদিনে আবার চিঠিগুলো ফিরে আসবে। খামের
ওপর লেখাগুলো আঁকাবাঁকা করে দিতে হবে। কালিকলম বদলে দিলে সন্দেহ হবে না। তাছাড়া
কন্যাদায়গ্রস্ত বাবার সময় কোথায় সন্দেহের। মোটামুটি সম্মানজনক একটা সমাধান জোটাতে
সুস্মিতার হালকা লাগল। সন্ধেবেলা জানালায় দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে দেখে সেই ছেলেটা
সিগারেট মুখে চা-গুমটির পেছন থেকে উঁকি মারছে। আদলটা চেনাচেনা লাগে খুব। কে? হোকগে যে খুশি। চিন্তার ব্যাপার একটাই,
যেভাবে ছিনেজোঁকের মতো লেগে আছে ছোকরা, চিঠি ফেলার সময় না পিছু নেয়। নিলেই বা কী। সুস্মিতা
পড়াতে যায়, ছেলেরা এসে গেছে। তখন ঘর থেকে ওয়াকারে ভর দিয়ে ইজিচেয়ারের দিকে হাঁটে
দেবপ্রসাদ। দুজন দুজনকে পেরোয় নীরবে। দেবপ্রসাদ মুগ্ধ চোখে মেয়ের পড়ানো শুনবে,
মেয়েকে দেখবে শসা-মুসুম্বির লো-ক্যালোরি টিফিন খেতে। সে সময় লালা, সর্দি, অশ্রু
গড়িয়ে পড়ে, মুখ, নাক, চোখ দিয়ে। যে কোনো পাঠক্রিয়ায়। সরল সুদ, অপনয়ন, অংশীদারি
কারবার কিংবা জ্যামিতির উপপাদ্যে। সবচেয়ে বেশি ইমোশনাল হ’য়ে যায় বজ্রগুণনের অঙ্কে। তখন সে ফোঁপায়।
পরের তিনদিন
সুস্মিতা চিঠিগুলো পোষ্ট ক’রল
পরিকল্পনামতো। নিজের ঠিকানায়, কালীপদবাবুর নামে। দু’ তিনটে স্টেশন ছেড়ে আলাদা
আলাদা শহর থেকে। বাড়ির কাছেই কত শহর অথচ সে আগে কখনো যায়নি। অচেনা বিদেশে ত্রস্ত
অতিথির মত ঘুরল। কোনান ডয়েল আর ক্রিস্টির সম্ভ্রান্ত অপরাধী গৃহকর্ত্রীর মত চোখের
কোণ দিয়ে চারপাশ দেখল, সবাইকে মনে হ’ল অনুসরণকারী। বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে ফাঁকা
দেখে ডাকবাক্সে চিঠি ফেললো। এক বাক্সে নয়, আঞ্চলিক ছোট কেন্দ্রগুলোয়। এক বাক্সে
কেন নয়, তার যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর নেই। নিজের কান্ডে অবাক হ’ল সে। তবু ঘোরের মধ্যে সন্দেহজনক কাজগুলো
করে গেল। পুরো সময়টা তার মনে হ’ল অনেকে দেখেছে, এইবার ধরা পড়বে। ধরা সে
পড়ল না। পরপর তিনদিন এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশন কখনও যায়নি সুস্মিতা। অপরাধবোধ
থাকলেও এই সংক্ষিপ্ত অভিসার তার মধ্যে উত্তেজনা জাগালো। চেনা মানুষের মুখোমুখি
হবার আতঙ্ক জাগিয়েছিল নিষিদ্ধ উন্মাদনা। যদিও কাউকে জবাব দেওয়ার নেই, কেউ তা চাইবে
না, সুস্মিতা ভালোভাবেই জানত।
চিঠি পোষ্ট করার
পরের কটা দিন সুস্মিতা পোষ্টম্যানের অপেক্ষায় রইল। এক এক ক’রে চিঠি আসে আর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। পোষ্টম্যান ঢুকলে সে
প্রার্থনা করে এবার যেন ঠিক বাক্সে পড়ে। তবু একটা চিঠি তার কাছে ফিরল। তালা খুলে
বুক ফুলিয়ে ফেরত দিল সে, ‘মেশোমশাই আপনাদের চিঠি আমার বাক্সে এসেছে , নিন। ’
ছোটখাটো কৌতূহ’ল যত
বাড়ছিল ভেতরে, বাহ্যত সুস্মিতা তত খোলামেলা হ’য়ে পড়ছিল। বুড়ো পাহাড়ের অটুট গাম্ভীর্যের ওপর কোমল
ঘাসপালা গজাচ্ছিল। ফুরফুরে ভাবটা ছেলেদের মধ্যে সংক্রামিত হয়। সেদিন পড়াতে গিয়ে
দিদিমণি দেখে বোর্ডে খড়ি দিয়ে লেখা- বিন্দু টানলে রেখা হয়। নিচু ক্লাশের জ্যামিতিক
সংজ্ঞা হ’লেও এ আসলে পুরনো চুটকি, হিন্দি সিনেমার ভ্যাম্প ও নায়িকাকে
নিয়ে। রেখা প্রথমদিকে বিন্দুর মতই ভারী ছিল। পরে রূপ খোলে। দ্বিতীয় চুটকিটা ছিল,
রেখা ভাঙলে বিন্দু হয়। এটা শরীর ভাঙার সংকেত। কলেজে খুব চলতো এমন ইঙ্গিতপূর্ণ
বিকৃতি। সুস্মিতা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে ভাবে, কিছু জিনিস কখনও বদলায় না। তার খারাপ
লাগে না। কমনীয় মুখে ডাস্টার দিয়ে সে বোর্ড মোছে। তারপর অঙ্কের প্রশ্ন লেখে টেন
ইয়ার্স থেকে। লিখতে লিখতে তার মনে পড়ে আরও কাজ বাকি। আঠারো বছর ধ’রে ঘরের কোণে অস্পৃশ্য পড়ে আছে এক বাক্স
চিঠি। তার ড্রপবক্স, এবার সেটার ব্যবস্থা ক’রতে হবে।
( আগামী সংখ্যায় সমাপ্য )
No comments:
Post a Comment