সব খেলার সেরা
এই মরশুমের শেষ
ম্যাচ। দেখতে যাওয়ার ইচ্ছেটা তাই স্বাভাবিক। যদিও উত্তেজনা অনেকটা কম, কারণ আগের
ম্যাচেই আমার ক্লাব ভারতসেরা হয়ে গেছে, তাই মন খুলে দেখা যায়। তবুও ফুটবল কি আর
নিশ্চিন্তে, বিনা উত্তেজনায় দেখা যায়?
ফুটবল এদেশে ভদ্রলোকদের
খেলা নয়। ভদ্রলোকেরা ঠিক জব্দও করে উঠতে পারে না খেলাটাকে, পছন্দও করে না। যেমন
আমার বউ। কিউবিকল সদৃশ এই ফ্ল্যাটে তার অনুপস্থিতিতে আমি খেলা দেখি, তাও শব্দ
কমিয়ে, এটা আমার একটা নিষিদ্ধ আনন্দ। ভাগ্য ভাল এদেশে খেলাগুলো এখনও বিকেল নাগাদ হয়। আমার বউ কাজ সেরে
ফেরার আগেই খেলা শেষ আর আজকাল তার ফেরারও
ঠিক-ঠিকানাও নেই। তবু ধরা কি পড়ি না? মাঝে মধ্যেই পড়ি, আমার মুখে যে অভিব্যক্তি
লেগে থাকে খেলা দেখার পর, সে ধরে ফেলে, যেমন বেড়াল গেরস্ত বাড়িতে মাছ চুরি করে
খেলে। সে শরীর বেঁকিয়ে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে ‘আবার ওই খেলা, কী যে আলফাল দেখো,
তাও যদি বুঝতাম নিজে...’
ইঙ্গিত আমার
বিশেষ এক অক্ষমতার দিকে। তবে সেও যে দেখে না তা নয়, তবে তা নেহাৎ বিশ্বকাপ বা ইউরো
হলে এবং খেলা যত না দেখে তার চেয়েও খেলোয়াড়দের দেখে বেশি। বলিষ্ঠ মাংসপেশি, শারীরিক
পটুতা, স্ট্যামিনা, সঙ্গে ফ্যাশনেবল চুলের ছাঁট থেকে ট্যাটু – সব মিলিয়ে একটা
প্যাকেজ তার কাছে – রাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় উল্টো পাশ ফিরে শোয়।
আমার বন্ধুরাও
বলে, তোর এই বিচ্ছিরি অভ্যেসটা কেন ছাড়তে পারিস না? এমন ভাবে ওরা বর্ণনা করে যেন
মনে হয় আমি কোনো শ্যাম্পেন পার্টিতে লুকিয়ে বাংলা টানছি। আমি একটু দাঁত ক্যালাই তখন,
হাসুক ওরা, যদি আমার এই নেশার গল্প শুনে মজা পায় তো পাক।
যাকগে যে কথা
বলছিলাম, বিকেলের ওই ম্যাচগুলো – নেশার মতো। কত স্মৃতিও মনে আসে, ছোটবেলার স্মৃতি।
বাড়িতে সবাই মিলে খেলা দেখা চায়ের পর চা, চানাচুরের প্যাকেট, আমার এই খুপরিতে বসে
যেন নিজেকে আবার ছুঁতে পারি।
এই তো একটু আগে
বসেছিলাম জানলার পাশে, দেখি বিকেলের আকাশটা কেমন স্থির, উল্টোদিকের ছাদের গাছশুদ্ধ
টবগুলো যেন আঁকা, লেবুরঙা একটা হলদে আলো চারদিকে, দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এই শহরটা মনে
হল একটা বস্তি যেটা হঠাৎ ইট সিমেন্টে বেড়ে উঠেছে। ভাগ্যিস ফুটবল ম্যাচ ছিল, যদিও
অন্য ক্লাবের, আমি জানলাটানলা বন্ধ করে গরমের মধ্যেই আদুর গায়ে ফ্যানের খটখটানি
সমেত জমে গেলাম।
খেলার মাঠের এই
উত্তেজনাটুকু আমায় শান্ত করে। তারপর নিজের মনে গুনগুন করতে করতে স্নান করি, চা
বানাই, কেক বিস্কিট যা আছে তা খাই। আজ যেমন আমার পুরনো টেপ রেকর্ডার-এ ‘স্টিং’
এর গান চালালাম। গোটা তিনেক চলার পর গড়বড় করল যদিও, কিন্তু কী করা যাবে, পুরনো
ক্যাসেট রোদে দিয়ে যেটুকু চালানো যায়। নাইনটিন এইট্টিজ এর পপ এর প্রতি যেমন আমার
দুর্বলতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে এই পুরনো যন্ত্রের আওয়াজের প্রতি টান। ডিজিটাল সাউন্ড আমার মনে হয় বড্ড বেশি নিখুঁত,
আর অগভীর।
গান বন্ধ হওয়ার পর চুপচাপ বসে রইলাম, একবার
ভাবলাম খবর চালাই, কিন্তু কী দেখব? খবর-টবর আমি দেখি না। সারাক্ষণ খুন-জখম-ধর্ষণ –
এই যেন একটা খেলার মাঠ, দর্শকের উত্তেজনা আরি বেশি, রোমান অ্যাম্পিথিয়েটারের
গ্যালারিতে বসে সব্বাই – যতক্ষণ না নিজের ভাগ্যের ফেরে মাঠের ভিতর পড়ে যাচ্ছে।
এর চেয়ে চুপচাপ
বসে থাকা ভাল। সোফার চেয়ারে গা এলিয়ে বসে পা দুটো তুলে দিলাম সামনের টেবিলে। অক্ষম
বাঁ পা-টায় হাত বুলতে বুলতে জানলার বাইরে তাকালাম – মেঘ করেছে, কালবৈশাখীর খামখেয়ালে
বৃষ্টি নামতে পারে, মন্দ হয় না তাহলে।এই শহরটা একমাত্র বৃষ্টিতেই সবচেয়ে নয়নাভিরাম
কারণ তখন তা অস্পষ্ট, জ্যামিতির কঠিন নিগড়ের পৌনঃপুনিকতা ভঙ্গুর হয়, ঘষাকাচময়তা
দৃশ্যত।
হঠাৎ হাসি পেল ভেবে, বৃষ্টি নামলে বড়ির তলা জল
থৈথৈ। আমার বউ ফেরেনি এখনো এবং সে ওই জল ভেঙে চার তলায় উঠতে হলে তার মেজাজ বিগড়বেই। তার উপর আমি বাড়িতে
এমন ধ্যানী বুদ্ধের মতো বসে আছি দেখলে.... আমি অবশ্য এ ব্যাপারে নাচার,
আমি কাজ করি বাড়িতে বসে একটা কম্পিউটর আর নেট কানেকশন ব্যস, তার মাধ্যমেই রোজগার –
ভাগ্যিস, না হলে আমার পায়ের যা অবস্থা। আমারর বউ অবশ্য মনে করে এর জন্য আমিই দায়ী –
তোমার নেচারটা ঘরকুনো ধরনের না হলে এমন হাল হত না। হয়তো ঠিকই বলে। সে অন্য ধরনের
মানুষ, বাইরের পৃথিবীটা তার কাছে অনেক বেশি প্রিয়।
ঘড়িতে দেখলাম
ছটা বেজে গেছে। এখন বৃষ্টি হলে জল নামতে নামতে নটা বেজে যাবে, তার আগে অবশ্য সে
আসবে বলে মনে হয় ন। তবুও বলা যায় না। আজকাল অবশ্য তার বাড়ি ফেরার সময়ের ঠিক থাকে
না। সময়টা ভাল না এই মাইট-ইজ-রাইট সন্ধ্যার শহরে তাকে নিয়ে আমার উদ্বেগ থাকে।
কিন্তু সে শুনবে কেন? আর এটাও সত্যি তার আর আমার যাপনটা তো এক নয়।
২
আজ সকালে উঠে
নিজেকে বেশ চাঙ্গা লাগল। এটা খুব দরকারি, আমার মতো যারা রোজ বাড়ি থেকে বেরোয় না বা
যাদের কাজের সঙ্গে অফিস নামক যাতায়াত জুড়ে নেই, তাদের কাজে বেরনোর জন্য একটা
প্রস্তুতি লাগে। মনে মনে নিজেকে তৈরি করতে হয় বেরনোর জন্য, চট করে অভ্যাসে বেরিয়ে
পড়া যায় না। অবশ্য এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা, বন্ধুরা বলে এটা আমার অসুখের
পর হয়েছে, বউয়ের ধারণা নেহাৎ ঘরকুনোমি।
গিজার থেকে গরম
জল নিয়ে, অল্প ঠাণ্ডা জল মিশিয়ে দাড়ি কামাতে শুরু করলাম আস্তে ধীরে। আমার বাঁ পা-টা
অকেজো হওয়ে যাওয়ার পর থেকে এইসব কাজে একটু বেশি সময় লাগে। লাগুকগে, তা নিয়ে আমার
কোনো কষ্ট নেই। তাড়াহুড়ো জিনিসটা আমি ঘেন্না করি। এটা ভাবতেই চোখ চলে গেল অন্য
ঘরের দিকে – তিনি তৈরি হচ্ছেন, অসম্ভব দ্রুতগতিতে – যেভাবে একসময় ম্যান ইউ খেলতো,
উইং দিয়ে দ্রুত দৌড় অন্য দিকে অফ দ্য বল ছুটছে স্ট্রাইকার, উইং থেকে তারপর জোরে
ভাসানো ক্রস।
বাথরুমের টুলে
বসে এমন আজগুবি সব ভাবছিলাম। আজ আমি বেরবো। জানলার ঘষা কাঁচে রোদ ঝলমল, দুপুরে বেশ
গরম হবে, তবু শরীরে মনে হল বেশ বেরনোর ইচ্ছে আছে। গরমটা আজ সহনীয় লাগছে। পাকা
চুলগুলোয় আনমনে হাত চালালাম, থাক রঙ করবো না, ভালই লাগছে একটু বড় হয়েছে। লোকে বলে
বয়সে তুলনায় আমার চুল ঘন, ন্যাচারালি স্ট্রেট। সেদিন এক মহিলা বললেন, বাবা আপনার
চুল এত সুন্দর, মেয়েরা পেলে... মনে হল বলি কী পেলে, চুল না পুরুষটিকে? বলে লাভ
নেই, খামোখা ফ্লার্ট করবে। তার বেশি কিছু করার মতো নয়, সামাজিক আড্ডা রঙ্গিণী
ককেট, বর বাচ্চা সামলে কয়েক ঘণ্টা ন্যাকামি-পোষ্য। এদের আমি বহু সময় দিয়েছি, আজকাল
আর সহ্য হয় না। এটা একটা সমস্যা আমার।
ব্লেডের তীক্ষ্ণ উষ্ণতাকে কোলোনের চিড়চিড়ে
ঠাণ্ডা দিয়ে ট্যাকল করে তারপর গালে হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত হয়ে বেরলাম। টেবিলে বউ বসে,
বেরনোর জন্য তৈরি, নাস্তা করছে। রুটিতে মাখন মাখাতে মাখাতে সে আমার দিকে তাকাল, ‘আজ
কোথাও বেরবে মনে হচ্ছে?’
ধরা পড়ে গেছি,
হু হা গোছের উত্তর দিলাম। সে ভ্রু কুঁচকে একবার তাকাল আমার দিকে কিছু বলল না,
দ্রুত খাবার শেষ করায় মন দিল। অর্থাৎ আজ তাড়া আছে। তার পোশাকে দেখলাম সাজগোজের
চিহ্ন – ঠোঁটে লিপস্টিক, ব্লাশ অন-এর হালকা ছাপ গালে, চোখে নীল আইল্যাশ – আজ তার
নিজের ব্যস্ততা রয়েছে, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত বা মগ্ন সময়ে সে আমাকে ঘাঁটায় না। এটা
বুঝে আরো খুশি হলাম, আজ বেরিয়ে খেলার টিকিট কাটব কোনো ঝঞ্ঝাট নেই। তারপর খেলার
দিন? সে তখন দেখা যাবে।
সে আপিসে বেরিয়ে
যাওয়ার পর আমি স্নানটান সারলাম। একটা ট্যাক্সি বুক করলাম। শাদা উর্দি পড়া ড্রাইভার
হাজির হল, আমি তাকে ঠিকানা বলতে সে অবাক চোখে তাকাল। কোনো রেড লাইট এরিয়ার নাম
বললেও সে এতটা অবাক হত না বোধহয়, আসলে লাঠি হাতে একটা লোক কোনো স্পোর্টস ক্লাবে
যাচ্ছে শুনলে সবাই একটু ভেবলে যায়। অথচ শরীর সচল রাখতে দু’পেয়ে ‘স্বাভাবিক’দের
থেকে আমায় ফিটনেস নিয়ে ভাবতে হয় বেশি, নাহলে এই চল্লিশ পেরনো বয়সে এসে ঠিক থাকা
সম্ভব নয়। সেটা অবশ্য সবার বোঝার কথাও নয়। যাকগে যা ইচ্ছে ভাবুক, আমি গাড়ির কাঁচ
তুলে দিলাম। ভ্যাপসা গরম আজ, মেঘ করে গুমট হয়ে আছে। কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত
গাড়ির ভিতর এসবের আঁচ লাগে না।
হোয়েন দ্য
থান্ডার কলস ইউ, গুনগুনিয়ে উঠলাম। ইস্ট সেভেন্টিন নামে একটা ব্যান্ডের গান। ব্যান্ডটা
টেঁকেনি, গানটা যদিও বেশ চলেছিল। হোয়েন দ্য থান্ডার কলস ইউ – শালা কী এক
অ্যালকোহলের নেশায় বা কোন নেশায় বাঁ পা-টা হঠাৎ পড়ে গেল, অচল, ডাক্তার দেখেশুনে
বললে ঠিক হতে পারে – আজ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর হয়ে গেল কোনো উন্নতি দেখছি না। আমি আর
আমার শহর একসঙ্গে গোল্লায় যাচ্ছি। এই যে কাঁচের জানলার বাইরে মুখগুলো দেখছি,
একেকটা শ্বাপদের মতো, ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি, রাস্তার মোড়ে, চায়ের দোকানের সামনে,
পাড়ার কোণে জটলায় সর্বত্র এদের দেখি আমরা, আমরা যারা গাড়ির কাঁচ তুলে পালাতে শিখে
গেছি। টাইট জিনস, চোখে শেডস, হাতে ব্রেসলেট, গুটখা শিখর, দামী সিগারেট ধোঁয়া
ছাড়ছে, মদ উড়ছে – এদের চোখ ঘুরছে কোথায় কার উপর ঝাঁপানো যায়। থ্রেট করে টাকা,
অসতর্ক অবস্থায় মেয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে মস্তি। আমরা পালাই, দেখি না, কারণ আমরা যা করি
ওরা আরো ক্রুড ভাবে করে নিতে শিখে গেছে।
মর গে শালা,
আমার কিছু এসে যায় না, আমি কোনো মহাপুরুষ নই – এই বয়সে এসে বুঝে গেছি আমাদের মিলিত
ধান্দাবাজি সমস্ত মহত্ত্বের আর আদর্শের ভণ্ডামির চামড়া ছাড়িয়ে নিয়েছে, উই আর
স্ট্রিপড নেকেড। গাঁড় ফাড়কে।
আমি আর রাস্তার
দিকে না তাকিয়ে সঙ্গে আনা বইটায় মন দিলাম। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা ক্লাবের গেটের বাইরে
এসে দাঁড়াল। আমার নামতে সময় লাগবে। পা দুটোকে একটু স্ট্রেচ করলাম প্রথমে। তারপর
বাঁ হাতের কনুইয়ের উপর লাঠিটার আর্ম ব্যান্ড শক্ত করে বাধলাম। ড্রাইভার দরজা খুলে
দাঁড়িয়ে আছে, আমি বেরনোর চেষ্টা করতেই সে হাত এগিয়ে দিল। ‘দরকার হবে না’ বলে আমি তার
হাত সরিয়ে দিয়ে নেমে দাঁড়ালাম। হালের ট্যাক্সিগুলো নিচু বেশ, অসুবিধে হয় না।
বাঁ হাতে লাঠি,
বাঁ কাঁধ থেকে ডান দিকে স্লিং করা ব্যাগ, আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি পড়বে এটা জানাই
ছিল। সে সবে পাত্তা না দিয়ে আমি এগলাম। ক্লাবের গেটের ভিতর দেখলাম লম্বা লাইন।
এটাতেই দাঁড়াতে হবে? রোদে বেশ চোখ ধাঁধিয়ে গেছে লাইনটাকে মনে হচ্ছিল অজগর। আলাদা
করে কাউকে বোঝা যাচ্ছে না। একটা গুনগুন আওয়াজ, অনেক মানুষ একসঙ্গে নিজেদের মধ্যে
কথা বললে যেমন হয়। দিশেহারা লাগল। ড্রাইভারটাকে দাঁড় করালে হত, কিন্তু রাউন্ড ট্রি
বুক করিনি সে দাঁড়াবে কেন?
লাইনে দাঁড়িয়ে
ঘাম হচ্ছে, বগলের কাছটা ভিজে উঠল, নানা টুকরো টাকরা কথা কানে আসছে। শালা একবার...
যদি গোল দিতে না পারে মাঠে নেমে ওর গাঁড় মারব.... খ্যাঁক খ্যাঁক হাঁসি.... বুড়ি
রেন্ডির শুকনো গুঁদে ঘষে দিতে হয় এমন ডিফেন্ডারের মুখ।
এমন সব চূড়ান্ত
অদ্ভুত আর্ষপ্রয়োগ মাঠেই শোনা যায় বোধহয়, এ জগত শুধু সমর্থকদের। এরা কারা? হাসি
পায় এগুলো শুনে অনেকে ঠাট্টাও করে ড্রয়িংরুমে বসে। এরা যাদের আমরা ‘লোয়ার ক্লাস’
বলি। সামগ্রিকভাবে এদের কেউ ঘাঁটায় না, তখন এরা দুর্দান্ত, অপ্রতিরোধ্য। তবু আমরা
ঠাট্টাই করি। কারণ ব্যক্তিগতভাবে এরা আমাদের সামনে কিস্যু না, হাত কচলায়, ঘাড়
নামিয়ে কথা বলে, চোখে চোখ রাখলে আমরা বলি বেয়াদব।
মুশকিল হল, ঘরে
বসে আমার এই সমবেদনা জানানো আর লাইনে এদের সঙ্গে দাঁড়ানো আলাদা জিনিস। বিশেষ করে
এমন পা নিয়ে, দু একটা ঠাট্টাও উড়ে এল বুঝতে পারছি, শোনা গেল আমাদের মাঝমাঠে নাকি
এক লম্বুর থেকে আমি বেটার খেলব শেষ ম্যাচে। লড়খড় করে দাঁড়াতে দাঁড়াতে মনে পড়ল
মিশার কথা। মিশা আমার প্রেমিকা, সুন্দরী ও সমাজ সচেতন। সে কি এই লাইনে দাঁড়াতে পারত? এই
এতগুলো পুরুষের সাথে তাদের শরীরী ভঙ্গির সামনে একপেশে সচেতনতা কোথায় যেত? অবশ্য
আজকাল তো মেয়েরাও আসে খেলা দেখতে। কয়েকটা ক্লাবের মহিলা-দর্শক-ব্রিগেড তৈরি হয়েছে
শুনেছি, দু এক ঝলক স্ক্রিনেও দেখেছি। কিন্তু মিশা বা আমার বউ বা আমার আশপাশের মেয়েদের সঙ্গে তাদের কোনো মিল
নেই – সেটা দেখেই বোঝা যায়।
হঠাৎ এক সাফারি
স্যুট পড়া বুকে কার্ড আমার দিকে ছুটে এল, ‘স্যার আপনি এই লাইনে কেন?’
‘ম্যাচের
টিকিটের জন্য।’
‘আপনার জন্য এ
লাইন নয়। আপনি আমার সঙ্গে আসুন।’
আমি আর কিছু বলার আগেই সে পিছু ফিরল, অগত্যা
আমিও তার সঙ্গে যেতে বাধ্য হলাম। আমি আলাদা কেন, হ্যান্ডিক্যাপড, হাতে লাঠি বলে? কিন্তু
তাহলেও তো আমি লাইনে দাঁড়াতে পারি, একটু অসুবিধে হয় বটে, কিন্তু পারি। সে সব কথা
আমার বলা হল না। কারণ সে ধরেই নিয়েছে আমি তার পিছনে আসছি। আর তা সত্যিও বটে।
লোকটির পিছু
পিছু ক্লাবের লন পেরিয়ে একটা বিল্ডিং এ ঢুকলাম। টানা করিডর দিয়ে গিয়ে একটা ছোট ঘর।
ঘরটার রঙ শাদা, শাদা আলোয় উদ্ভাসিত। মাঝখানে একটা একটা টেবিল। টেবিলের ওপাশের চোখে
সানগ্লাস একটা লোক, মেরুন রঙের স্যুট পড়া। আমার দিকে তাকিয়ে বসতে বলল, অবশ্য মাথা
তোলা থেকে বুঝলাম কারণ চোখে তো চশমা। আমি টেবিলের সামনে গদি আঁটা স্ট্রেট ব্যাক
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম।
‘আপনি খেলা
দেখতে চান?’
‘হ্যাঁ’
‘তো ওখানে লাইন
দিয়েছিলেন কেন?’
‘মানে ওটাই
তো....’
‘ওটা আপনাদের
জন্য না।’
আবেগহীন গলায়
লোকটি এটা বলে একটা হাত বাড়াল, ‘আইডি প্রুফ আছে আপনার সঙ্গে?’
এইরে সঙ্গে আছে
কি না মনে নেই। পার্সটা বের করে আমি খুঁজে পেতে একটা পেলাম। কার্ডটা তার বাড়িয়ে রাখা হাতে গুঁজে দিলাম। সে
নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল। তারপর একটা মেশিনে ঢুকিয়ে দিল – স্ক্যান করছে
বোধহয়। নৈর্বক্তিক মুখ। কোনো প্রশ্ন করার উপায় নেই। বরং সেই জানতে চাইল, ‘কী ভাবে
পে করবেন কার্ড না মোবাইল থেকে দেবেন?’
আমি কার্ড দিতেই
বলল, আপনাকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসবে।’
‘না না আমি চলে
যাব...’
স্মিত হেসে সে
জানাল, ‘তা তো সম্ভব নয়। তবে আপনি ক্লাবে চলে আসুন।‘ বুঝতে পারলাম না। সব নিয়মকানুন
বদলে গেল নাকি? তাই সই, ক্লাবেই আসব না হয়। মনে মনে একটা শব্দ ঘুরপাক খেতে লাগল –
স্পেক্টাকল। জানি না ফুটবলের যে আনন্দ তা কি আজ স্পেক্টাকল হয়ে দাঁড়িয়েছে, না আমি
স্মৃতিভ্রংশে সব ভুলে গেছি। কোন খেলা আমি দেখতে যাব, যেটা দেখব তার সঙ্গে আমার
মাথার ভিতর যে স্মৃতির অভিজ্ঞতা রয়েছে তার সঙ্গে মিল আদৌ আছে কি? এসব ভাবতে ভাবতে
একটা খামে ভরে টিকিটটা সে এগিয়ে দিল। দিয়েই নিজের কাজে ডুবে গেল, যেন আমি সামনে
নেইই। কথা বাড়ানোর উপায় নেই বুঝলাম। সাফারি পড়া লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে, সে আমাকে
বাইরে নিয়ে যেতে চায়। আমি একটা গাড়ি বুক করতে করতে তার সঙ্গে বেরিয়ে এলাম। লাইনটা
এখনো তেমনিই রয়েছে, যেন অনন্তকাল রয়ে যাবে, মানুষের মুখগুলো বদলে যাবে শুধু।
বদলাবে কি, আমি দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু একটা মুখও মনে পড়ল না, যদিও মিনিট পনের
আগেই তো এদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
গাড়িটার জন্য
মিনিট চারেকের বেশি অপেক্ষা করতে হল না। সেই একইরকম গাড়ি, সেই একইরকম উর্দিপড়া
ড্রাইভার। আমি গাড়ির পিছনের সিটে শরীরটা এলিয়ে দিলাম। এখন আর কিছু করার নেই
অপেক্ষা ছাড়া। মিশার কথা মনে পড়ল কেন? মিশাকে শেষ কবে দেখেছি, কত বছর আগে? খেলার
উত্তেজনা অনিবার্যভাবে নারী শরীরকে মনে পড়ায় নাকি? আসলে কোনো অঘ্রাণের বিকেলের সূর্যাস্তের
সৌন্দর্য নয়, আসলে অ্যাড্রেনালিন-রাশই শরীরের স্মৃতির প্রকৃত উৎস। একই মেয়েকে যখন
মনে পড়ে গান শুনতে শুনতে তখন সে অন্যরকম, আবার এই খেলার উত্তেজনার সময় আরেক।
আরেকটা অপেক্ষার কথা মনে পড়ল, সেও এক উত্তেজনার অপেক্ষা। মিশার জন্য। বাড়িতে একা,
বউ নেই, এমন সময় সে আসত। সে টেক্সট করে জানিয়েছে সে আসবে। আমার শরীর শক্ত হয়ে উঠত
অপেক্ষায়।
পায়ের এই অসুখটা
তখন শুরু হয়ে গেছে। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটাকে মিশা বলত – বাইরনিক। এইসব ইংরিজির ছাত্রীগুলো,
কিসে যে তাদের উত্তেজনা – আমি অবশ্য তাতে লাভবান। কবেকার কোন ইংরেজ কবির অক্ষমতা-জারিত-ভঙ্গিমা
একটা ম্যানারিজম হয়ে উঠেছিল বা সে বাধ্য হয়েছিল, তার থেকে যদি আমার ‘চলচ্ছক্তিহীন
হয়েছি’ কোনো পরকীয়াকে ওসকাতে পারে মন্দ কি? লর্ড বাইরন, লর্ড বাইরন, সে কি ফুটবল
খেলতে জানত? সে সময় আদৌ খেলাটা ছিল কি? তবে থাকলেও লর্ডটর্ডরা কাদায় নেমে চামড়ার
বল লাথাবে বলে মনে হয় না।
গাড়িটা বেশ ভালই
চলছে। আগেকার ট্যাক্সি এর পাশে ছ্যাকড়া গাড়ি। আধুনিক আপহোলস্ট্রি, চমৎকার হেলান
দেওয়া যায়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, কাঁচ তুলে দিলে আওয়াজ ভিতরে ঢোকে না, এমনকি
ইঞ্জিনের শব্দও না। রাস্তায় ফ্লুরোসেন্ট বাতি জ্বলে উঠেছে, সন্ধে সমাগত। লোকজন
যারা হাঁটছে ব্যস্ত, অনেকের নাকে মাস্ক। কারো সাধারণ কাপড়ের, কারোটা গ্যাস মাস্কের
মতো। কয়েকটা মেয়ের নাকে যেগুলো দেখলাম তাতে মনে হল ফ্যাশন ডিজাইনারের হাত রয়েছে।
এই মাস্ক দিয়েই কি পরবর্তী পৃথিবীর শ্রেণিবিন্যাস বোঝা যাবে? আমার বউ-এর একটা আছে
বটে, শহরের বেড়ে চলা পল্যিউশনের ভয়ে কেনা। আমার নিজের একটাও নেই, খেলা দেখতে যাওয়ার
সময় কিনতে হবে না কি?
ফ্ল্যাশ
গর্ডন-এর কথা মনে পড়ল, কোনো কোনো গ্রহে নামতে গেলে অক্সিজেন মাস্ক লাগত। হাহা
বাংলায় একটা সায়েন্স ফিকশনে ছিল ‘অম্লজানের বড়ি’, সেটা খেলে আর মাস্ক লাগত না।
কিন্তু সে কোন সময়ের লেখা মনে পড়ছে না, আমি বা কোন সময়ে রয়েছি, এখানে কেউ ফ্ল্যাশ
গর্ডনের নামও জানে না। সায়েন্স ফিকশন ব্যাপারটাই কেমন সন্দেহর চোখে দেখে। আর আমিও
অবশ্য ভাবি, এই যে যা ছোটবেলায় ভাবতাম কল্প বিজ্ঞান তা যদি সত্যি হয়ে ওঠে তবে
অস্বস্তি একটা হয় হয়তো – এই যেমন মাস্কটা দেখে মনে হল, তবে এরা কেউ ভীনগ্রহী নয়,
নয় কি? এই গাড়িটাকেও তো উন্নত কোনো যান আর বাইরের মানুষগুলো অন্য কিছু ভাবতে ভালই
লাগছে। হঠাৎ সেই জন্যই তারা কি সহনীয় হয়ে উঠল? একটু আগেও আসার সময় এদের মনে হচ্ছিল
আতঙ্ক, অস্বস্তি – এখন ভীনগ্রহী ভেবে মজা লাগছে। এ খেলাটার মধ্যে আরেকটু থাকতে
ইচ্ছে করছিল – কিন্তু গাড়ি এসে থামল বাড়ির সামনে।
৩
বউ ফিরে প্রশ্ন
করল না কোথায় গিয়েছিলাম। আমাকে আমার নির্দিষ্ট কোণে, নির্দিষ্ট চেয়ারে দেখে সে
নিশ্চিন্ত। যে কোনো বিবাহিত সম্পর্কে যেটা হয় আর কি। একটা অভ্যেস, সে অভ্যেস জিরে
ধনের গুঁড়ো তার নির্দিষ্ট কৌটোয় রয়েছে কি না, কিংবা সপ্তাহে দুবার বিছানার চাদর
বদলানোর পৌনঃপুনিকতায় সস্তি খোঁজে। এর মাঝে কিছুটা কামরাদারি, কিছুটা আনন্দ ফুর্তি
বা হঠাৎ শরীরে শরীরে সঙ্গমে তৃপ্তি। কাজেই সে চোখের কোণায় আমাকে দেখে ধাতস্থ এবং
আমার বেরনোর ব্যাপারে সে নিঃসন্দেহ হলেও কারণ যাচাইয়ে সে আপাতত নিরুদ্যম।
গতকালের মেঘলার
পর বৃষ্টি হয়নি, ফলে গরম আরো বেড়েছে। আমি একটা ভিজে তোয়ালে নিয়ে বসে রয়েছি, মাঝে
মধ্যে ঘাড়ে গলায় ঠেকাচ্ছি। মাথার ভিতর ঘুরছে খেলা দেখতে যাওয়ার কথা। এবার সত্যিই
যাচ্ছি, কে জানে হয়ত শেষবার। বিশাল ক্রীড়াঙ্গনটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। যেন
অ্যাম্পিথিয়েটার। এসব ভাবতে ভাবতেই পর্দায় টুকটাক খবর স্ক্রোল করছিলাম, মূলত
বিনোদন মূলক। চটকা ভাঙল বউয়ের গলায়, ‘তুমি কি ডিনার করবে এখন? অনেক তো রাত হল।’
ঘড়ির দিকে
তাকিয়ে দেখি এগারোটা, স্লাইডিং-গ্লাস-টানা জানলার বাইরের পৃথিবীতে অজস্র আলো তারার
মতো ফুটে রয়েছে, সেই সব আলো-আলোকিত মানুষগুলির গল্প কেমন জানি না, আমারই মতো হয়তো,
বা আরো একটু উচ্ছ্বাস বা আরেকটু বিষাদ। আকাশ যথারীতি ধুলোময় ফলে এইসব আলোর
বিচ্ছুরণে ঘোলাটে কমলা। বৃষ্টিই না এলে এই ধুলোময়তা থেকে রক্ষা নেই। আমাদের শহরে এই
একই রঙ তাই।
রাতে খাওয়ার পর
বাঁ পায়ে সেঁক দিতে বসলাম, রোজই দিই খাটে বসে একটা ইলেকট্রনিক পট্টির সাহায্যে।
কাজ কী দেয় জানি না তবে আরাম হয়। সামনের আয়নায় নারী শরীরের প্রতিবিম্ব। পুরোটা নয়,
কোমর থেকে বাম ঘাড় পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি, আমার বসার কোণটা থেকে। নেগ্লিজির রেশমি কাপড়ের
স্বচ্ছতায় পাছার উত্তল ও কোমরের ভাঁজ যা চোখে পড়ছে তা এখনো উত্তেজক। যদিও ফটফটর
ফটফটর তালু দিয়ে গালে ক্রিম ঘষার আওয়াজ সেই উত্তেজনাকে নিউট্রালাইজ করার জন্য
যথেষ্ট। ঘাড়ের কাছে দেখলাম চুমুর দাগ – লাভ বাইট! আগে হলে এনিয়ে চিন্তা বা আরো
কিছু থাকতে পারত এখন নেই, আমি বহুগামিতার উত্তেজক উদ্দীপক খেলা থেকে এখন কোনো
আনন্দ পাই না, শরীর থাকলে যৌনতা থাকবেই কোনো না কোনো ভাবে, তাকে নিয়ে অহেতুক আতঙ্ক
বা আহা উহু দুটোই সমান অর্থহীন। ওটা যেন ঝুলে আসা চামড়ার মতো, এই যে গলার দুএকটা
ভাঁজ, বা লোমের বৃন্তে বুটি দাগগুলো মতই – থেকে যাবে সারা জীবন।
৪
একটা জাল দেওয়া
বাসে করে আমরা রওনা হলাম ক্লাব থেকে মাঠের উদ্দেশ্যে। এভাবে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা
কবে হল? আমি শেষ কবে মাঠে গিয়ে খেলা দেখেছি তা মনে করতে পারছি না, ফলে এভাবে গেছি
কি না মনেও পড়ছে না, বিস্মৃতিই বেশি আমার – আমার এই গুলিয়ে যাওয়া স্মৃতি নিয়ে এখন
আর আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই মেনে নিয়েছি। আর অন্যরাও দেখেছি খুব একটা মাথা ঘামায়
না আর। কি নিয়েই বা ঘামায়, সবাই কেমন ব্যস্ত, নিরলস ভাবে প্রত্যেকটা দিন আর আগামী
কয়েক ঘণ্টার ব্যাপারে প্রখর এক উত্তেজনায় থাকে, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে শুধু তাই নিবেই
আলোচনা করে যা কয়েক ঘণ্টার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া কিছু নিয়ে আলোচনা যেন
অসামাজিক ব্যাপার, যেন নিষিদ্ধ কোনো কাজ।
গাড়িটা শীতাতপ
নিয়ন্ত্রিত। আমার আশপাশের সহযাত্রীদের দিকে তাকালাম – বেশ সুবেশা সুবেশী, তারা আরাম
করে চেয়ারে বসে, হাতে তাদের বড়সড় ট্যাব, কানে ইয়ারফোন গোঁজা। এত অনুত্তেজিত মুখ
কেন? খেলা দেখতে যাচ্ছে অথচ সেই ফুর্তি কোথায়? ড্রাইভারের পাশে আমাদের দিকে মুখ
করে একটা স্ক্রিন লাগানো – তাতে ক্লাবের খেলার স্ট্যাটিস্টিক্স ভাসছে, কোন মাঠে
কাকে হারিয়েছে, কত গোল। কেউ কেউ সেদিকে তাকিয়ে কী একটা হিসেব করছে। আমার তাতে
একটুও উৎসাহ নেই, খেলা দেখতে যাওয়ার সময় এসব কেউ ভাবে নাকি, আমি কি পান্টার না
বুকি? এরা কি তাই? ধুর এসব কি ভাবছি?
বাসটা শহরের
মাঝের দিকে না গিয়ে পশ্চিমমুখো হল, ওদিকে আবার কোন মাঠ? শহর থেকে বেরিয়ে পূর্ব
দিকে যে মাঠটা রয়েছে তাতে অনেকদিন খেলা হয় না। সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ,
বিজ্ঞান-প্রযুক্তির শো, রবোটিক্স-এর নতুন আবিষ্কারের উন্মোচন এইসব চলে। এই করে
মাঠটা হয়তো নষ্টই হয়ে গেছে। তা রোমের অ্যাম্পিথিয়েটারের যদি ভগ্ন দশা হতে পারে এরই
বা হবে না কেন? আমাদের শহরের মাঝখানে, যাকে শহরের ফুসফুস বলা হত (এখনও বলা যেতে
পারে, কিন্তু তার হাল দেখে নিজেরাই ভয় পাই, তাই বলি না) সেখানে কয়েকটা ছোট ছোট মাঠ
ছিল, আমি ভেবেছিলাম সেখানেই হবে। সুবিধে হত, টুক করে বাড়ি ফিরে আসা যেত, বউয়ের
প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হত না।
ফুটবল খেলা নিয়ে
কেন এই প্রশ্ন ওঠে এখন, সবাই সন্দেহ করে কেন খেলাটাকে? খুব শারীরিক
প্রতিযোগিতামূলক বলেই কি – আমাদের ভিতরের রিপুগুলোর খুব কাছাকাছি, যা আমাদের চঞ্চল
করে তোলে, এবং এই পৃথিবীতে বাস করতে গেলে সেগুলো ক্ষতিকারক – ছোটবেলা থেকে তা
শেখানো হচ্ছে আমাদের। প্রতিটা বাস টার্মিনাসে, রেল স্টেশনে, বড় বড় বিল্ডিং-এর
গায়ের ডিসপ্লেতে সারাক্ষণ বলে যাওয়া হচ্ছে শান্ত ও সামাজিক থাকার কথা। এমন সময়ে এই
খেলাটাকে চালু রাখা হয়েছে এটাই ঢের।
অথচ
প্রতিযোগিতাহীন খেলার ভাবনাটাই হাস্যকর, এগারো এগারো বাইশটা লোক বল নিয়ে কসরৎ
করছে, ড্রিবল করছে, ডজ করছে, হেড দিচ্ছে, ভলি মারছে – শুধু তাই দেখে যাওয়া
হাস্যকর। তার চেয়ে জিমন্যাস্টিকস দেখা ভাল। সেই রকম খেলাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যেমন
গল্ফ – সাফসুতরো খেলা বটে।
গাড়িটা এসে
দাঁড়াল গঙ্গার ধারের একটা ঘাটে। ড্রাইভার দরজাটা সুইচ টিপে খুলে দিল। সবাই লাইন
দিয়ে নামছে, কোনো ঠেলাঠেলি নেই। আমি ক্রাচের স্ট্র্যাপটা শক্ত করতে একটু সময়
নিলাম। সবার শেষে নেমে দেখি একটা ফেরি পেরনোর লঞ্চ। একটু পুরনো, লঝঝরে। হলুদ রঙের
ভেসেলটার মধ্যে একটা ইস্পাত কঠিন যান্ত্রিকতা রয়ে গেছে। এখনকার যন্ত্রগুলোর
রুক্ষতা ঢেকে দিয়ে তার একটা মানবিক চেহারা দেওয়ার চেষ্টা হয় – যা আরো বিরক্তিকর
যান্ত্রিকতা – এটা তেমন নয়। ভাল লাগল।
আমরা লাইন দিয়ে
উপরের ডেকে উঠলাম। আকাশে তাকিয়ে দেখি মেঘ করেছে, নদীর উপর কালো মেঘ ঘনাচ্ছে,
চারিদিক পাণ্ডুরতা পাচ্ছে। এই নদী, এই জনপদ এখন সময়াতীত। মেঘদূতের পথের কোনো নগরও
হতে পারে। আসলে এভাবে ভেবে নেওয়ার একটা মজা আছে যেটা আমি ছোটবেলায় আবিষ্কার
করেছিলাম, জানি না এটা এটা সবার থাকে কি না, আমার কত কাল্পনিক বন্ধু, দেশ, গ্রাম, মহাকাশ
যান সব ছিল। এখনো মন থেকে তারা মুছে যায়নি।
লঞ্চটার
দুলুনিতে একটু অসুবিধে হচ্ছিল আমার, ক্রাচটা শক্ত করে ধরে বসলাম। ভাগ্য ভাল বেশি
সময় লাগল না। ওপারে পৌঁছতেই হালকা বৃষ্টি শুরু হল। এই ঘাটে নেমে টিকিট দেখিয়ে মাঠে
যেতে হবে ঘোষণা করেছিল লাউড স্পিকারে। নামার সঙ্গে সঙ্গেই একটা লোক এগিয়ে এসে
টিকিট স্ক্যান করে হাতের কবজিতে একটা ছাপ মেরে দিল। ওতেই সিট নম্বর রয়েছে। ঘাটের
সেতু পেরিয়ে দেখলাম গোটা দশেক রো তৈরি হয়েছে স্টিলের ব্যারিকেড দিয়ে। আমাদের
সরণিটা মাঝ বরাবর। বৃষ্টির ছাট এসে গায়ে লাগছে, বেশ বড় বড় ফোঁটা, ভিজে যাচ্ছি।
আস্তে আস্তে এগোচ্ছিলাম, আমার তাড়া নেই, পাশ দিয়ে যারা বেরিয়ে যাচ্ছে বেরিয়ে যাক। ভেজা
চোখে চিনতে ভাল করে দেখতে পাচ্ছিলাম না আশপাশের লোকজনদের। কে গেল, ওই মেয়েটা, চেনা
লাগল এত? স্লিভলেস ব্লাউজ, শাড়ি, ওই হেঁটে চলে যাওয়া আমি চিনি, ওই কোমর বহুবার
আমার শরীরকে আশ্রয় দিয়েছে – ঠিক মিশার মতো। আগুনরঙা শাড়ি ভিজে শরীরে লেপটে – বুক
দুটোকে আরো উদ্ধত করেছে, কপালে কালো আঁকাবাঁকা শাপের মতো টিপ – আমার বউ অমন পড়ে।
হলপ নিয়ে বলতে পারব না ঝাপসা চোখে কাকে দেখলাম। যেমন বলতে পারছি না পাশের সরণি
দিয়ে যে যে একটু হেসে ডান কানের লতি চুলকোতে চুলকোতে চলে গেল সে সৌপ্তিক কি না –
আমার ছোটবেলার বন্ধু সৌপ্তিকের মতোই লাগল। কিন্তু এরা কেন আসবে, ফুটবল এদের কাপ অফ
টি না, এ ভদ্রলোকেরা দেখে না, দেখা উচিৎ না বলে এখনো তর্ক চলে। তাহলে খেলাটাও কি
বদলে গেল? না কি এভাবেই এরা আসে আমি জানতে পারিনি।
এই সুশৃঙ্খল দর্শক
প্রবাহ, এই যে তাদের হাসিমুখে লাইন দিয়ে ঢোকা, পপকর্ন কিনে সিনেমা দেখতে যাওয়ার
মতো – ফুটবল কি শুধু এইটুকুর জন্য? আর কেমন একটা চোরা তৃপ্তি, আসলে আমরা দেখি
কিন্তু বলি না, অনেকটা লুকিয়ে পর্নোগ্রাফি দেখার মতো, ঠিক তেমন মুখ করেই ঢুকছে।
এই যে লোকটা
আমার পাশে বসে, মাঝবয়সী, মাথার চুল কম, থপথপে চেহারা, কেমন পা ফাঁক করে ছড়িয়ে
বসেছে – এর জামা থেকে পায়ের জুতো বলে দিচ্ছে এ আমারই শ্রেণির মানুষ। আমার দিকে
তাকিয়ে একটু অবাকই হল ক্রাচ দেখে, তারপর অপ্রস্তুত হেসে বলল ‘আপনি কোল্ড ড্রিঙ্ক
নেবেন একটা?’ লোকটার দুহাতে ঢাকা দেওয়া কাগজের গ্লাস, তার থেকে স্ট্র বেরিয়ে আছে।
আমি অল্প হেসে মাথা নাড়লাম। এখানে চেয়ারগুলো অনেক স্বচ্ছন্দ। জায়গাটাও কাঁচে ঘেরা।
এ যেন মাঠের মধ্যেই এক আলাদা জগৎ। প্রত্যেকেই যারা বসেছে তারা নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে
বসছে। উত্তেজনা আছে কি না জানি না ভিতরে, কিন্তু কোনো শারীরিক প্রকাশ দেখছি না।
এভাবে এরা সিনেমা, আর্ট গ্যালারি, কোনো আর্ট অফ লিভিং-এর বক্তৃতা যে কোনো জায়গায়
যেতে পারে। আমি নিজেও এদের মধ্যে বসে, এদের মতোই হয়ে গেলাম। নাকি আসলে আমি এমনি
ছিলাম? বাকি যা ভাবছি সেগুলো কল্পনা। আমি কোনো দিন মাঠে খেলা দেখতে এসেছিলাম তো
আগে?
‘আর বলবেন না, অফিস
থেকে ছুটি করে আসার কী ঝামেলা, বলা তো যায় না এসব দেখতে আসছি, তাহলেই হাজারটা
প্রশ্ন, হ্যা হ্যা হ্যা...’ পাশে লোকটি বলে উঠল। আমি কি উত্তর দেব জানি না, বউ-এর
কথা মনে পড়ল, আমি আস্তে আস্তে বললাম, ‘হুম, সবারই এক....’
সেই মুহূর্তে প্লেয়ারদের
নাম ঘোষণা শুরু হল। এরপর গান শুরু হবে, ক্লাবের থিম, শহরের, দেশের আরো কত কিছু।
কিন্তু সেই সব দর্শকেরা কোথায়, যাদের টিকিট-এর লাইনে আমি ভুল করে দাঁড়িয়ে
পড়েছিলাম? আমার এই কাচে ঘেরা গদি আঁটা নরম চেয়ারের এনক্লোজারে তো তাদের দেখতে
পাচ্ছি না? আমার মনের কথাটা যেন শুনতে পেল পাশের লোকটি, আমার দিকে ফিরে বলল, ‘ভাগ্যিস
আমাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে, ওদের সঙ্গে বসে দেখা যায় না মশাই।
‘কেন?’
‘আপনি বোধহয়
অনেকদিন আসেননি মাঠে?’
আমি মাথা নাড়লাম। কত দিন,
নিজেও ভুলে গেছি। লোকটি নিজেই বলে গেল কারণটা, ‘আরে গত বছর ওই যে মেয়েগুলো ঠ্যাঙ
তুলে তুলে নাচে, তাদের একজনকে মাঠে নেমে ঘাড়ে কামরে দিয়েছিল। হুলুস্থুলুস ব্যাপার,
খেলাই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।’
‘কোথাও দেখিনি
তো!’
‘আরে মশাই মাঠের
সব খবর কি আর ছাপে না দেখায়... এসব কি দেখানো যায়? আর বলিহারি যাই, আমাদের এনক্লেভ
থেকেও সে দেখে কয়েকজন হাততালি দিলো। ভাবুন একবার! কাদের মধ্যে যে কারা লুকিয়ে.....’.
ভোঁওওওওওওওওও
ইলেকট্রনিক
হুইসিল বেজে উঠল। খেলা শুরু সঙ্গে সঙ্গে একটা ঢেউ এসে পাড়ে ঠেকার মতো শব্দ একটা
ভাঙল, ওই ওদের ওখান থেকেই ফেটে পড়ছে শব্দটা যাদের কথা আমি ভাবছিলাম, একটা চিৎকার
মিশে যাচ্ছে খেলার সঙ্গে। আমার শরীরে একটা মৃদু কাঁপুনি উঠে মিলিয়ে গেল। আশা করি
পাশের লোকটি বোঝেনি। কারণ স্পেক্টাকল পেরিয়ে আরো স্নায়বিক, আরো জান্তব কিছু একটা
খেলে গেল শরীরে।
No comments:
Post a Comment