অর্ঘ্য দত্ত বক্সী

মহাকাব্যে উপেক্ষিতা- পর্ব ২- ঊর্মিলা


I would, in my opinion, if I get a chance, like to be a side role or extras. In fairytales, in dramas, cinemas as also in dreams and hallucinations all fixes himself/herself with the hero or heroines. All of us, in our unconscious, wish to get attached with the predominant character of hero of the story. So they become out of the realm of practicality. On the other side, in a role to which all make fun and who are represented as funny, jokerlike, dull, morbid, humiliating characters – we don’t make ourselves attached to them. But they are the key personalities by which the heroism of hero is glorified. I praise side roles like URMILA, the wife of Laxman, in Ramayana.
প্রকৃতপক্ষে বিশাল কালো আকাশের প্রেক্ষাপটটা হল সাইড রোলেরা যার বিপ্রতীপে নায়ক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠে। কখনো কমিক রিলিফ কখনো সেটের প্রপার্টিজের থেকেও নগণ্য কোন এক এক্সট্রা ... এরা না থাকলে পৃথিবীর কোন উপন্যাস কোন সিনেমাই হত না। ক্ষুদ্র পিপীলিকাবৎ কিন্তু অসীম অনন্তসিনেমা শেষ হয়ে যায়, নায়ক নায়িকার মিলন বিচ্ছেদে এক গল্প সমাপ্ত হয়কিন্তু এদের কি হল তা থেকে যায় অনির্ণেয়, কল্পনা চলে কেবলমাত্র তাদের ভবিতব্য নিয়ে এদের মনে হয় uncertainty principle এর তত্ত্বে একটি ইলেক্ট্রনের মতোই...যেহেতু এদের নিয়ে এত কম বলা থাকে এত গ্যাপ থাকে তাই এদের নিয়ে কল্পনা ততোধিক ডানা মেলে দেয়। ডেফিনিট নাম চরিত্র ইউনিক বৈশিষ্ট না থাকা মানুষগুলো এক এক জন আর্কিটাইপ পারসনিফায়েড হয়ে ওঠে।
ঊর্মিলা যদি বনবাসে যেতেন তবে হয়তো গোটা রামায়ণের কাহিনীই অন্যধারায় প্রবাহিত হত। রবীন্দ্রনাথ “ কাব্যে উপেক্ষিতা ” প্রবন্ধে করুণ রসের স্নিগ্ধ আলো ঊর্মিলার উপর ফেলে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের পুনর্সচেতন করেছেন। অহল্যা -শবরী – কৈকেয়ী – সুমিত্রা – শূর্পণখা  ও অন্যান্য নারীদের ক্ষেত্রেও এই মহাকাব্যীক উপেক্ষা কিন্তু সমানভাবে প্রযোজ্য।
মূলতঃ রামায়ণের সমাজে পুরুষতন্ত্রের এহেন একচ্ছত্র একনায়কত্ব দেখে হতবাক হতে হয়। হিসাব মেলানো যায় না যখন এই রামকথার উৎস সন্ধানে গেলে চরম মাতৃতান্ত্রিক সিন্ধু সভ্যতাতেও তার চিহ্ন পাওয়া যায়। খুব স্বভাবসিদ্ধভাবেই প্রাচীনতম যে সমাজ মাতৃতান্ত্রিক, নারী স্বাধীনতায় সহজ – সেখান থেকে উদ্ভূত হলেও রামায়ণ কি করে এহেন পুরুষতন্ত্রের বিজয় গাথা হয়ে উঠল তা গবেষণার বিষয়, ও গবেষণা হয়েছেও প্রচুর।
তবুও ঊর্মিলার মতো কিছু নারী চরিত্ররা শুধু বর্তমানের মহাকবির হৃদয় বীণাতেই ঝংকার তোলেনি, দক্ষিণ ভারতের চারণকবিদের গানেও রবীন্দ্রনাথের বহু আগে থেকেই রামায়ণে উপেক্ষিতা এই রমণীদের জন্য সহমর্মিতার আবেগ মথিত হয়েছে। তারই একটি আখ্যান এখানে বর্ণিত হল “ ঊর্মিলা নিদ্রা ” রূপে।
রামের influence এ রামায়ণ জুড়ে ব্রহ্মচর্য ও সতীত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি বড্ডো বেশী। রাম    নিজেও কনজুগাল লাইফে পূর্ণ ব্রহ্মচারী ও তার সন্নিকটে যে যে এসেছে যথা লক্ষণ, হনুমান, অঙ্গদ, যুদ্ধকালীন বিভীষণ এমনকি কামুক সুগ্রীবও সকলকে নিতে হয়েছে ব্রহ্মচর্য ব্রত। রামের সেক্স কোড অফ কন্ডাক্ট অনুযায়ী বালী অপরাধী হওয়ায় তাকে পেতে হয়েছে মৃত্যুদণ্ড আর সীতার প্রসঙ্গ ( অগ্নিপরীক্ষা , সীতাত্যাগ  ইত্যাদি ইত্যাদি ) থাক। তেলেগু অন্ধ্রের ডিরেক্ট আর্য influence মুক্ত স্বাধীন চারণ কবিরাও রামায়ণের এই চরম chastity এর প্রবণতাকে উপেক্ষা করতে পারেননি। তাই লক্ষণ বনবাসে যাওয়ার পর ঊর্মিলা নিজেকে প্রাসাদের মধ্যে বন্দী করে গভীর কোমার মধ্যে চলে গিয়ে চোদ্দো বছর ঘুমিয়ে কাটান। ঊর্মিলা নিদ্রা !!! অথবা যদি বা ধরা যায় তা নয়, তাহলেও একটি ঘরে স্বেচ্ছা বন্দিনী থেকে যাবতীয় লোকচক্ষুর আড়ালে চোদ্দো বছর কাটান ঊর্মিলা স্বপ্নে বা ডে ড্রীমেও শুধু লক্ষণ চিন্তা করেঅন্য কোন পুরুষের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাবতীয় পুরুষের থেকে তাকে সরিয়ে রাখে অযোধ্যার পুরুষতন্ত্র শাসন যেন স্বাভাবিক সাধারণ জীবন কাটালে তার সতীত্ব প্রমাণিত হয় না রামায়ণে আমাদের যুগের আদালতসুলভ প্রত্যক্ষ সাক্ষী সাবুদ সহ লোক দেখানো প্রমাণের বড়ই কদর তা তো দেখাই যাচ্ছে  ঊর্মিলার চোদ্দো বছরের স্বপ্নেও সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি হয়ে থাকবে শুধুই লক্ষণই এমত বন্দোবস্ত না হলে রামায়ণের লোককথাও চলে না !!!

লঙ্কা বিজয় করে অযোধ্যায় ফিরে লক্ষণের কি প্রথম কর্তব্যই ছিল না তার তৃষ্ণার্ত বধূটির সঙ্গে      দেখা করা? কিন্তু রামের রাজকার্য নিয়েই মেতে গেলেন লক্ষণ এবং রামের দিক থেকেও লক্ষণকে কোন স্মরণ করানো বা আদেশ নেই ঊর্মিলা গমনে। আসলে রাম চিরকালই এরকম। নারী, যৌনতা, সতীত্বের প্রশ্নে অদ্ভুত রুক্ষ্ম। নিজেকে বিনা কারণে ডিপ্রাইভ করে আর নিজের ফলোয়ারদেরও কষ্ট দিয়ে তার কি বীভৎস মজা মনে মনে!!! কেন যে রাম চরিত্র এমনতর কে জানে ... মেসোসিস্ট। কিন্তু একজন নারীই নারীর বেদনা অনুভব করে। এবং সে যদি হয় অগ্নিপরীক্ষা দেওয়া সীতা মা গো।
সীতা সেই স্বেচ্ছাবন্দিনী হতভাগ্যা নিদ্রামতীর কাছে লক্ষণকে যেতে দেওয়ার জন্য রামকে অনুরোধ করেন। আশ্চর্য , এতক্ষণে লক্ষণ যেন জানলেন তার স্ত্রী বলে একজন আছেন ( মানে যেন ভুলেই গিয়েছিলেন !! ) এবং জানলেন এখন তার স্ত্রী কি অবস্থায় আছেন, কিভাবে তিনি এতগুলো বছর কাটিয়েছেন ইত্যাদি!!!
এবার, পাঠকগণ --- কি প্রত্যাশা করছেন ...? লক্ষণ যাবেন সেই অন্তঃপুরে আর জাগিয়ে তুলবেন তার সতীত্বের মূর্তিমতী সরলা বধূটিকে আর করবেন চোদ্দো বছরের অবরুদ্ধ প্রণয় ? তা নানা, নানা না না না ... এমন এমনকি চারণকবিদের মুখের রামায়ণ গল্পেও হয় না। এবার দাদার থেকে কম কিসে লক্ষণের মতো করে অগ্নিপরীক্ষা ঊর্মিলার জন্য !! a psychological game ! অথবা রামের দাস হয়ে থাকতে থাকতে অনেক অন্যরকম লক্ষণ চরিত্রেও রামের হীনম্মন্যতা রামের পলিটিক্যাল কারেক্টনেস রাজনীতি সঞ্চারিত হয়ে যায়!
ঊর্মিলার শয্যার পাশে বসে লক্ষণ বললেন – হে প্রিয়ে, এই দিব্যকান্তি প্রেমিক তোমার অনুপম মুখশ্রীকে গ্রহণ করতে এসেছে – বললেন যখন তার ব্যবহার রুক্ষ্ম ও নিজের মধ্যেই নিজে দ্বন্দ্বময়! চোদ্দবছর যে রমণী একবারের জন্যও চোখের পাতা খোলেননি সহসা তার কক্ষে এক intruder এর, ধর্ষকের উপস্থিতি টের পেলেন। তার বিলাপ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হল –
       কে আপনি? কেন এই বলাৎকারেচ্ছা?
       জীবনের অলিগলি দিয়ে চলতে চলতে
       কিভাবে এই পথের ভুল করে বসলেন?
       কেন আমার এ নিভৃত কক্ষে অনধিকার প্রবেশ?
       আমার পিতা জনক বা আমার বোন ও তাদের স্বামীরা
       জানলে আপনার প্রবল জীবন সংশয় অবধারিত।
       আর যদি রাম জানতে পারেন
       তাহলে তিনি আপনাকে জীবিত রাখবেন না...।
আধোতন্দ্রায় বলা কথাগুলো শুনে লক্ষণ আশ্বস্ত হচ্ছিলেন কিন্তু তার যে পরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি। ঊর্মিলা ডেস্পারেট হয়ে তাই তার লজ্জা ও পাতিব্রত্যতা সহযোগে সাবধান করলেন সেই intruder কে ...
       ইন্দ্র পরস্ত্রী কামনা করে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েছিলেন
       রাবণ ও তার বংশ পরস্ত্রী কামনায় ধ্বংস হয়েছে
       কীচক পরস্ত্রীর প্রতি নজর দিয়ে পরলোকে গেছে
       কোন সাহসে তুমি আমায় ধর্ষণেচ্ছা রাখো? ...
অপূর্ব এখানে চারণ গানের আকুতি, সরল ও বাহুল্যবর্জিত আবেগময়...
তো শেষপর্যন্ত লক্ষণকে চিনতে পেরে ঊর্মিলার পতিপ্রণাম –
       এক পবিত্র মুহূর্তে রাজা জনক আমায় তোমার হাতে তুলে দেন। পুরুষ এক এক সময় একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এমনই মনোনিবেশ করে যে, যে যে তাকে ভালবাসে তাদের সকলকে ভুলে যায়। অন্যদিকে মনোযোগ দিয়ে, পুরুষ তার প্রিয়তমাদের ছোট করে – হায়, এমনই পুরুষেরা !
এ এক চিরন্তন সতী ও পরমুখাপেক্ষী নারীর হাহাকার। এ হাহাকার এতই দগদগে প্রকাশিত যে এখানেই নারীবাদের বীজ নিহিত হয়ে আছে। হ্যাঁ, রামায়ণে নারীবাদ বারবার তার অবমাননা পায়, আর তাই সে এই কাব্য নিয়ে এত আক্রমণাত্মক।
লক্ষণ ঊর্মিলার মিলন হয় এরপর সীতার আয়োজনে। যে লক্ষণ চোদ্দো বছর কিছু না খেয়ে এমনকি না ঘুমিয়ে রাম সীতার সেবা করেছেন আর যে ঊর্মিলা পতিকে অবচেতনের আসনে বসিয়ে চোদ্দবছর তার ধ্যানে সমাধিস্থ হয়ে থেকেছেন তাদের চিরপিপাসিত বিপরীতের মিলন হয় শেষপর্যন্ত, happy ending, পাঠকও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন
তবে বারবার এ সুখশ্বাস পড়েনি কারণ মূলে একবারই ঊর্মিলার শুধুমাত্র নাম প্রসঙ্গ এসেছে এবং তা রাম সীতা প্রেম খুনসুটির মধ্যে লক্ষণকে লজ্জা দেওয়ার জন্য সীতা কর্তৃক কৌতুকে আমরা এ ম্যাডেনিং নীরবতায় বিষ্ময়ে বিস্ফারিত বিদীর্ণ হয়ে যাই ভাবতে বাধ্য হই বাল্মীকির কোন গভীর মনস্ততব কাজ করেছে কিনা এখানে !! হয়তো রামের সীতা ব্যবহারে তিনি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট লজ্জিত তাই আরো একটি নারীনিগ্রহ তিনি সামনে আনেননি অথবা হতেও পারে তার ইন্টেনশন আসলে সম্পূর্ণ উলটো!         
 আমাদের সাধারণ পাঠকের কাছে কিন্তু সীতার সঙ্গে প্রতিতুলনা চলেই আসে ঊর্মিলার। প্রশ্ন আসে কার স্যাক্রিফাইস বেশী বড়ো? সীতার - যিনি রামের সাথে বনগমনের ক্লেশ নিলেন না ঊর্মিলার - যার স্বামী তাকে ছেড়ে যাওয়ায় চোদ্দবছর বিরহে জ্বলতে জ্বলতে যৌবনের চাহিদায় পুড়তে পুড়তে মহাকাব্যীয় নিদ্রামগ্ন রইলেন? তাকে ঘিরে কোন বড় ঘটনা ঘটেনি , যুদ্ধ হয়নি রাবণ মরেনি আর বিরহ জ্বালা তার দেখা যায় না বাহ্যিকভাবে , এমনকি নিজের কাছেও তাকে গোপন করে রাখে ঊর্মিলার সো কল্‌ড নিদ্রা , সেলফ হিপ্নোসিসে, আত্মনিপীড়নের আনন্দে তাই অলিখিত অনুচ্চারিত subaltern সাইড রোল হয়ে থাকে ঊর্মিলা। কিন্তু সমগ্র শিল্পে যদি সবচেয়ে সম্ভাবনাময়, সর্বশ্রেষ্ঠ সাইড রোলের কোন উদাহরণ দিতে হয় তবে অবশ্যই তা রামায়ণের ঊর্মিলাই। হতভাগ্য সীতা রামের মতো স্বামী পেয়ে, তার তবু আশা বিশ্বাস ভরসা রয়েছে আপামর ভারতবাসীর জাতির জননী রূপে পূজিতা হয়ে... তার থেকেও অনেক বেশী হতভাগ্যা ঊর্মিলা এক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেওয়া রামদাসকে পেয়ে ... তার দুকূলই গেল, সম্বল রইলো শুধু যুগে যুগে কবি হৃদয়ের কূল ছাপানো দরদ। 

No comments:

Post a Comment