সৌমালি চৌধুরী

আজান

একজন পেইন্টার যখন ছবি আঁকেন তখন তিনি শিল্পী । একজন ভাস্কর যখনম্যুরাল তৈরী করেন তখন তিনি শিল্পী। একজন গাইয়ে যখন মঞ্চে গান গাইতে ওঠেন তখন তিনিশিল্পী। একজন অভিনেতা যখন মুখে রঙ মেখে ক্যামেরার সামনে শট দেন তখন তিনি শিল্পী।এইসবের পর যখন একজন ফোটোগ্রাফার ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলেন, তিনি দিনের শেষে ফোটোগ্রাফারফোটোগ্রাফি কেন শিল্প নয়,এই নিয়ে বহু বিতর্ক চলে আসছে সেই ট্যালবট এর ক্যালোটাইপ এর আমল থেকে।শব্দটির উৎস হচ্ছে গ্রীক শব্দ ক্যালোস(kalos)-অর্থ সুন্দর। বিংশ শতক এর ব্যাতিক্রম এডওয়ার্ড ওয়েস্টন, অ্যালফ্রেড স্টিগ্লিটজ, এডওয়ার্ড স্টিশন, ইমোজেন কানিংহ্যাম এঁরা আভান্ত- গার্দ চর্চা শুরু করেন ফোটোগ্রাফিতে। পিকটোরিয়েলিসম এর পাশাপাশি কমার্শিয়াল ফোটোগ্রাফি, প্রিন্ট মেকিং এর মাধ্যমে এরা প্র্যাকটিস চালিয়ে গেছেন। সেইসময় ইমোজেন কানিংহ্যাম এর লেখা একটি বই 'ফোটোগ্রাফি অ্যাস আ প্রফেশন ফর উইমেন'। টাইটেল থেকেই বোঝা যায় সময়ের প্রেক্ষিতে কাজটি নিঃসন্দেহে র‍্যাডিকাল।

আমি এ নিয়ে বিশেষ ভাবিত নই।এর দুটো কারণ আছে। প্রথমত আমি শিল্প বা শিল্পী এই গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করি না। দ্বিতীয়ত ফোটোগ্রাফি কে আমি আমার কাজ এর সর্বোচ্চ মাধ্যম বলে মনে করি না। বরং তুলনামূলকভাবে একটি দুর্বল মাধ্যম বলেই মনে করি।

ম্যান রে বলেছিলেন ' যা আমি আঁকতে চাই না তার-ই আমি আলোকচিত্র তুলি আর তা-ই আমি আঁকি যার আমি আলোকচিত্র তুলতে পারি না।'

নো স্লামস
নো পভার্টি
নো ব্রথেল

ছবি তোলার ক্ষেত্রে আমি এই তিনটি রুল মেনে চলি। ফোটোগ্রাফ কি?এর মাধ্যমে কিভাবে সমাজ-সংস্ক্তি,রাজনীতি,জীবন,যৌনতা,দেশ-কাল বোঝানো সম্ভব?একটি ছবি বা এক গুচ্ছকন্সিস্টেন্ট ফোটোগ্রাফ এর মাধ্যমে জীবনের কারণ ও ধারা বোঝানো সম্ভব। এই ভাবে একটা একটা করে ছবি সাজিয়ে জীবনের গল্প বলা হয়। হতে পারে সেটা পোলিটিক্যাল কিংবা নন পোলিটিক্যাল।  অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় সমাজের সমস্ত সেন্সিটিভ ইস্যু নিয়ে দেশ বিদেশের ফোটোগ্রাফার-রা কাজ করেছেন। এর মধ্যে কমন বিষয় গুলি হল নারী নির্যাতন, যৌনকর্মী-র জীবন, রেপ ভিক্টিম, সাব কন্টিনেন্ট এর দারিদ্র, বন্যা, ইত্যাদি বিষয়। কন্টেম্পোরারি ফোটোগ্রাফি ফলো করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ ফোটোগ্রাফার নিজেদের ফোটো আক্টিভিস্ট হিসেবে দাবী করছেন। ফোটোগ্রাফির মাধ্যমে তারা সামাজ ওলটপালট ঘটানোর কাজে নিয়োজিত। একজন স্টুডেন্ট হিসেবে আমার ও উচিৎ এদের ফলোয়ার লিস্ট এ নাম লেখানো। কিন্তু আমি তা করছি না। অন দ্য কন্ট্রারি আমিতলে তলে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখি। কারণ আমি ফিল করি যে আমি এইপ্রক্রিয়াটির মধ্যে ঢুকে গেছি। এখান থেকে বেরোবার কোনো পথ নেই। এখানে আমার কাছেবিশাল এক ক্যানভাস দেওয়া হয়েছে, রঙ, তুলি, সরঞ্জাম যা যা প্রয়োজন সবই আছে, আমাকেএখান থেকেই কক্ষপথ খুঁজে বের করতে হবে। এতগুলো ভ্যারিয়েবল এর মধ্যে কন্সট্যান্টএকমাত্র আমি এবং আমার সাথে ক্যামেরার শাটার এর দূরত্ব। চ্যালেঞ্জ টা সেখানেই।
আমাদের ক্লাসে শেখানো হয় 'ফিউয়ার সিচুয়েশন মোর ফোটোগ্রাফ' অর্থাৎ প্রচুর দেখ, কম ছবি তোল। আমি এতে বিশ্বাসী নই, কেউ যদি মনে করেন তিনি প্রচুর ছবি তুলবেন, তা তিনি অনায়াসেই করতে পারেন, এটা একদম সেই ব্যাক্তির ও তাঁর হার্ড্ড্রাইভ এর একান্ত সম্পর্ক। কারণ একটি ছবির একাধিক ব্যাবহারিক প্রয়োগ হতে পারে। এবং এই  ডিজিটাল সময় পোস্ট প্রসেসিং এর যে ব্যাপক বিস্তার তাতে করে কোনো ছবি বাতিল ছবি নয়।যদিও এ বিষয় আমি খুব অলস। আমি ছবি তুলে সেগুলো অনেক দিন এমনি ফেলে রাখি, ভাব-টা অনেকটা এমন যেন শুকোতে দিয়েছি। এরপর কোনো এক মন খারাপ করা বর্ষা রাতে জেগে উঠে  এডিট করতে বসা হয়। রবি ঠাকুর এইরকম কোনো এক বর্ষা রাতে লিখেছিলেন 'আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার'। এডিট করতে বসে আমার সমস্ত ডিপ্রেশন কেটে যায়, যেটা অনেক সময় অভিসারের সমতুল্য। এরপর ভোরের আলো ফোটে , কাছাকাছি কোনো বন্ধু থাকলে ডেকে নিয়ে চা-বিড়ি খেয়ে খানিক আড্ডা দিয়ে বাসায় এসে ঘুম এবং এই ঘুম যে কি ঘুম তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।
সুতরাং গাঢ় ঘুমের পূর্ব শর্ত হল রাত জেগে ছবি এডিট করা। এই ভাবে টানা ৬-৭ দিন বসলে একটা গোটা কাজ শেষ করা যায়। আমেরিকান ফোটোগ্রাফার অ্যালেক্স ওয়েব বলেছেন যে প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ছবি তোলা হয়, বিষয় আত্মস্থ করা হয়,এবং কি তুলছি , কেন তুলছি এই গোটা প্রক্রিয়াটি হল একজন ফটোগ্রাফার এর পুরস্কার। ওয়েব এর এক একটি ছবি দেখে আমি দীর্ঘ সময় নিয়ে চিন্তা করি ছবিটি কেন এত জনপ্রিয়। তাঁর ছবিতে কালার এবং সাবজেক্ট এর জাক্সটাপোসিশন আমায় মুগ্ধ করে। যে কোনো সাধারন বিষয় ও অ্যালেক্স ওয়েব এর হাতে পিকচারেস্ক হয়ে ওঠে। ওর ছবি দেখে আশর্য হই কিভাবে উনি নিঃশব্দে একের পর এক খুন করে যান। ছবিতে আনপ্রেডিক্টিবিলিটি বুঝতে হলে অ্যালেক্স ওয়েব দেখতে হবে।

সুতরাং

 আজান; আজানের সুরে দৃশ্যকল্পের বিস্তারে ভেসে চলা ছাড়া গতি নেই।
এদেশের খেয়াল, ভজন, রামপ্রসাদী ধারার চলনে সেই গোমতি কাশি গোমূখ নিম্নপ্রবাহে বিলীন উপত্যকায় জমজন্ম (জন্মমৃত্যু) খেলা।
একমাত্র বৈষ্ণব কাল্ট তথা সমগ্র ভক্তি আন্দোলনের ক্ষণিক মাতলাম
আংশিক পথচারি সূচনা বলা যায়একে।


কিন্তু হলে কি হবে সবইতো ওই বাংলাদেশের জেলায়, গ্রামে
খুলনা শহরে যাদের বাড়ি তাঁরা এইসকল ভাবাধারা থেকে সেই বিচ্ছিন্নই হয়েছে , দেখা যাবে। এবার প্রসঙ্গে এসো কারাগ্রামে, জেলায়, সদর শহরে থেকে গেছে, তারা নির্ঘাত পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়, বা একাংশ তাঁদের মধ্যে দেখা যাবে , কেউ হয়ত চাষীর ছেলে, কেউ বা কামার, কুমোর, সামান্য সংখ্যক কবিরাজ, শিক্ষক, মৌলনা, পীর, এইসব।


এখন কারা শহরে, কলকাতায় এল। তারা কারা কিছু এল৪৭, এরপর আবার কেউ এল ৭১ এর যুদ্ধে । এখানে প্রশ্ন কেন এল? এদের পক্ষে আসার সুযোগ ছিল, সহজ কোনো পরিবর্তী পন্থা আয়ত্ত্বে ছিল, নাকী উল্টোটা, একেবারে সর্বহারা, ভাগচাষী, খেতমজুর, গরীবজেলে, এদের যখন কিছুতেই দিনের খাবার জুটল না, তখনই তারা বিকল্প জীবিকার আশ্রয়ে ক্রমে শহরের দিকে এগিয়ে যায়।

No comments:

Post a Comment